সুগন্ধা পয়েন্টে উচ্ছেদ হওয়া অর্ধশতাধিক দোকান থেকে কোটি কোটি টাকা ভাগবাটোয়ারা করেছে প্রভাবশালীরা

সুগন্ধা পয়েন্টে উচ্ছেদ হওয়া অর্ধশতাধিক দোকান থেকে কোটি কোটি টাকা ভাগবাটোয়ারা করেছে প্রভাবশালীরা

ইনানীর রয়েল টিউলিপের সামনে সৈকতের বিশাল চর দখল করে জেটি নির্মাণে জীববৈচিত্রের বিচরণ বাধাগ্রস্থ হওয়ার আশংকা

মুহাম্মদ তাহের নঈম:

শহরের কলাতলীর সুগন্ধা পয়েন্টে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে গুড়িয়ে দিয়েছে ৫২টি অবৈধ স্থাপনা। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে গিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ,ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ায় সুগন্ধা পয়েন্ট এক পর্যায়ে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এতে পুলিশ, সাংবাদিকসহ অন্তত ২০ জন আহত হয়। এ ঘটনায় ১০ জন ব্যবসায়ীকে আটক করেছে পুলিশ। গতকাল সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উচ্ছেদ হওয়া স্থাপনার মধ্যে হোটেল রেস্তোঁরা, শুঁটকি মাছের দোকান, ট্যুরিজম অফিস, ফার্মেসি ইত্যাদির দোকান, বার্মিজ পন্যের হারেক রকমের দোকান রয়েছে।

জানা যায়, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের কলাতলী সুগন্ধা পয়েন্টে ৫২টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ২০১৮ সালের ১০ এপ্রিল উচ্ছেদের নোটিশ দেয়। পরে জনৈক জসিম উদ্দিনসহ ৫২ জন একটি রিট আবেদন দায়ের করলে ২০১৮ সালের ১৬ এপ্রিল হাইকোর্ট রুল জারি করে স্থগিতাদেশ দেন।

অভিযোগ রয়েছে উক্ত জমি নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলা,রিট পিটিশন স্বত্বেও কিছু অতি মুনাফা লোভি চক্র সরকারী খাঁস জায়গার দখল বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। সাথে জড়িত রয়েছে প্রশাসনের একশ্রেনীর দুর্নীতিবাজ আমলা। অনেকে রিট পিটিশনের কপি দেখিয়ে দোকান লাগিয়ত করেছে লাখ লাখ টাকায়। অনেকে রাজনীতির দোহায় দিয়ে দোকান বিক্রি করেছে। আবার অনেকে মানবাধিকার কর্মী বলে,অনেকে নেতার আত্মীয় পরিচয়ে, অনেকে বিভিন্ন সংগঠনের পরিচয়ে মোটা টাকায় দোকান লাগিয়ত করেছে। আসন্ন পর্যটন মৌসুমকে সামনে রেখে মোটা টাকায় দোকান নিয়ে মাথায় হাত দিয়েছে। সব মিলিয়ে সুগন্ধা পয়েন্টে ৫২টি অবৈধ স্থাপনা থেকে কয়েক কোটি টাকার অবৈধ লেদদেন হয়েছে। এ টাকার ভাগ কে বা কারা নিয়েছে ? তা এখন খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, কলাতলীর সুগন্ধা পয়েন্টে উচ্ছেদ হওয়া অর্ধশতাধিক দোকান নির্মাণ করে ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছেন প্রভাবশালীরা। অনেকে এই দোকান বিক্রি করে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে ও জনশ্রুতি রয়েছে। এই সব মার্কেটে এক একটি দোকান ৩০লাখ,৬০ লাখ থেকে কোটি টাকায় বিক্রি হলেও সরকারের তহবিলে এক টাকাও জমা হয়নি। মাসিক কোনো ভাড়াও দিতে হয় না দোকান মালিকদের। সম্পূর্ণ বিনা ভাড়ায় সরকারি ভূমিতে দোকান তুলে ব্যবসা করে যাচ্ছেন প্রভাবশালীরা। সেখানেও অনেক দোকান হাতবদল করে বিক্রি হয়েছে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকায়। কলাতলীর সমুদ্র সৈকতের এই সুগন্ধা পয়েন্টে চলছে হরদম দখলবাজি। সরকারি শত কোটি টাকার জমির ওপর প্রতিনিয়ত গড়ে ওঠছে নানান অবৈধ স্থাপনা। দিনে যেমন-তেমন গভীর রাতে বৃষ্টি উপেক্ষা করে চলে দখলের মহোৎসব। প্রশাসন কোনো মতেই দমাতে পারছে না শক্তিশালী দখলবাজদের। সুগন্ধা পয়েন্টের রাস্তার উত্তর পাশে রয়েছে রাজনৈতিক পরিচয়ে দখলবাজ সিন্ডিকেটের সারিবদ্ধ হরেক রকমের অবৈধ দোকান। এই দখলবাজদের শক্তিশালী একটি নেটওয়ার্ক রয়েছে। যারা সুগন্ধা পয়েন্টেরে পূর্ব পাশে বিশাল একটি পাহাড় ও দখলে রেখে তারা নোটারী মূলে বিক্রি করছে মোটা টাকায়। অভিযোগ রয়েছে এই অসাধু সিন্ডিকেট প্রশানের সাথে সেলপি তুলে বিভিন্ন জায়গায় ধান্ধা করে। অপরদিকে ইনানী বীচ এলাকার বালিয়াড়ির চরের মাঝ খানে অবৈধভাবে দখল করে ট্রলার ভ্রমনের জন্য বিশাল জেটি নির্মাণ করার অভিযোগ উঠেছে হোটেল রয়েল টিউলিপ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। এর ফলে বঙ্গোপসাগরের স্বাভাবিক স্রোত বাধাগ্রস্থ হয়ে সামুদ্রিক কাছিম, লাল কাঁকড়াসহ জীববৈচিত্রের অবাধ বিচরণ বাধাগ্রস্থ হবে বলে মনে করছেন বিক্ষুব্ধ পরিবেশবাদীরা। আর পরিবেশ আইন তোয়াক্কা না করে সৈকতের বালিয়াড়ি দখল করে এরকম পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকান্ড চলে আসলেও রহস্যজনকভাবে নিরব রয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন। হোটেল রয়েল টিউলিপের সামনে সৈকতরে বিশাল চর দখল করে সেখানে নিজেদের অতিথিদের জন্য বসিয়েছে কিটকেট চেয়ারসহ নানা বিনোদনের উপকরণ। এনিয়ে সেখানে তাদের ব্যবসা চালিয়ে গেলেও পরিবেশগত সংকটাপন্ন এ এলাকায় বঙ্গোপসাগরের স্বাভাবিক স্রোত বাধাগ্রস্থ, পাশাপাশি জীববৈচিত্রের চরম ক্ষতি হচ্ছে। অন্যদিকে কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহককারি পরিচালক জানান,আমাদের থেকে কোন অনুমতি ছাড়া এ জেটি নির্মাণ করছে। যখন আমরা তাদের বাঁধা দিয়েছি তখন বলে, আমরা আমাদের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে এটি নির্মাণ করছি।
উল্লেখ্য,বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ ্রসৈকত কক্সবাজারের ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সৈকত রক্ষায় ১৯৯৯ সালে লাবনী পয়েন্ট থেকে কলাতলী পর্যন্ত এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন হিসেবে ঘোষণা দিয়ে গেজেট প্রকাশ করে সরকার। কিন্তু সেই গেজেটকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ওই এলাকায় একে একে গড়ে উঠেছে হোটেল-মোটেলসহ নানা স্থাপনা। এর মধ্যে রয়েছে ২০টি তিন, চার ও পাঁচতারকা মানের হোটেল। হোটেল সিগাল, সাইমন, কক্স-টুডে, প্রাসাদ প্যারাডাইস, ওশান প্যারাডাইস, অভিসার, সি-ওয়ার্ল্ড, সি-প্রিন্সেসের মতো অভিজাত হোটেলও রয়েছে সৈকতের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায়। এ নিয়ে পাঁচটি রিটের চূড়ান্ত রায়ে ১৯৯৯ সালের পর গড়ে ওঠা এসব হোটেলের ইজারা বাতিল করে সেগুলো গুঁড়িয়ে দিতে বলেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। ২০১৮ সালের ৯ ডিসেম্বর প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে সাত বিচারপতির আপিল বেঞ্চ এ রায় দেন। এক বছর পর ২০১৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর রায়টি আপিল বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। রায়ে স্থাপনাগুলো ভেঙে ক্ষতিগ্রস্তদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতেও বলা হয়েছে। সরকারি জমি দখল করে অবৈধ দোকান নির্মাণকারীদের উচ্ছেদের ব্যাপারে ইতিপূর্বে মাইকিং করা হলেও নিজেদের উদ্যোগে অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে না নেয়ায় অবশেষে জেলা প্রশাসন,কউক,পৌর সভা, ধারাবাহিকভাবে শনিবার দুপুরে ৫২ টি স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযানে নামে। কক্সবাজারে ভ্রমনে আসা দেশী-বিদেশী পর্যটকরা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করায় প্রশাসন কে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তাদের মতে বীচ এলাকা কে ঘিরে এত স্থাপনার দরকার নেই। প্রাকৃতিক পরিবেশ দেখার জন্যই ট্যুরিষ্টরা কক্সবাজারে আসেন। কক্সবাজারে বেড়াতে আসা সাংবাদিক জসিম উদ্দিন সরকার (চীফ রিপোর্টার সন্দ্বীপ খবর) ও শান্ত বনিক (বিশেষ প্রতিনিধি দৈনিক বাংলার নবকন্ঠ) দৈনিক কক্সবাজার ৭১ কে জানায়, কক্সবাজারের সৌন্দর্য দেখতে হাজার হাজার পর্যটকদের সমাগম হয়। এসব অবৈধ স্থাপনা দেখে ট্যুরিষ্টরা হতাশ হয়, উদ্বেগ প্রকাশ করে। এবিষয়ে জেলা প্রশাসন, কউক ও পৌরসভার কর্মকর্মকর্তা রা জানায়, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও সৈকতের সুন্দর্য বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় আরো ব্যবস্থা নেবে। অবৈধ স্থাপনা নিজেদের উদ্যোগে সরিয়ে না নিলে আগামীতে আরো অভিযান চালাবে প্রশাসন।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস

বাংলাদেশে

আক্রান্ত
১৭৮,৪৪৩
সুস্থ
৮৬,৪০৬
মৃত্যু
২,২৭৫

বিশ্বে

আক্রান্ত
৬৩,২৭২,৪৪৮
সুস্থ
৪৩,৭৬০,৪৩২
মৃত্যু
১,৪৬৯,০৪০
সর্বশেষ (গত ২৪ ঘন্টার রিপোর্ট)
আক্রান্ত
মৃত্যু
সুস্থ
পরীক্ষা
২,৯৪৯
৩৭
২,৮৬২
১৩,৪৮৮
সর্বমোট
১৭৮,৪৪৩
২,২৭৫
৮৬,৪০৬
৯০৪,৫৮৪

একাত্তর পত্রিকার প্রতিনিধি সভা

dainikcoxsbazarekattor.com © All rights reserved
x