এনআইডি জালিয়াতি করে বয়স কমিয়ে চাকরিতে

এনআইডি জালিয়াতি করে বয়স কমিয়ে চাকরিতে

ডেস্ক নিউজ:

ব্যাপক অনিয়মের মাধ্যমে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে চাকরি পাওয়া অফিস সহায়করা নিয়োগবিধির শর্ত পূরণে ভয়ংকর জালিয়াতি শুরু করেছেন। তাঁদের একজন সাবিনা ইয়াসমিন আবেদন না করেই জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংশোধন করে বয়স কমিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে বড় ধরনের জালিয়াতি করা হয়েছে বলে জানাচ্ছেন খোদ নির্বাচন কর্মকর্তারা। নিয়োগপ্রাপ্তদের আরেকজন শরিফুল ইসলাম আবেদন করেও বয়স কমাতে ব্যর্থ হয়েছেন। এখন তিনি দ্বিতীয় আবেদন করেছেন। আর নাসরিন আক্তার নিজেকে কুষ্টিয়ার বাসিন্দা প্রমাণে স্থায়ী ঠিকানা পরিবর্তনের আবেদন করেছেন। ওই আবেদন গ্রহণ করতে একজন যুগ্ম সচিবের কাছ থেকে হুমকি পাওয়ার কথা জানিয়েছেন নির্বাচন কর্মকর্তা। নিয়োগপ্রাপ্তদের আরো কয়েকজন বয়স কমানোর জোর তদবির চালাচ্ছেন বলে কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা গেছে। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে এনআইডি জালিয়াতির ঘটনা নিয়ে তোলপাড়ের মধ্যেই এসব ঘটনা ঘটছে।

গত ২৪ আগস্ট কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক নিয়োগবিধি লঙ্ঘন করে নিজ বাসার বাবুর্চি ও নিরাপত্তা প্রহরীর দুই বোন এবং অন্য জেলার এক বাসিন্দাসহ মধ্যবয়সী ১৬ জনকে রাজস্ব শাখায় নিয়োগ প্রদান করেন। এই নিয়োগে কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে বলে অভিযোগ আছে। এ নিয়ে গত ৬ অক্টোবর কালের কণ্ঠ’র শেষ পৃষ্ঠায় একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। অনিয়ম নিয়ে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে গত ১৬ নভেম্বর নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের পদায়ন করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর রাজস্ব শাখায় ১৫ জন অফিস সহায়ক ও একজন নিরাপত্তা প্রহরীর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। এতে প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি এবং বয়স ১০ অক্টোবর ২০১৯ তারিখে ১৮ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে হতে হবে বলে উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া প্রার্থীকে কুষ্টিয়া জেলার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে বলে শর্ত দেওয়া হয়। তবে এসব শর্তের ব্যত্যয় ঘটিয়ে ত্রিশোর্ধ্ব ব্যক্তিকে যেমন নিয়োগের ঘটনা ঘটেছে, তেমনি অন্য জেলার বাসিন্দাকেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দুই হাজার ৬০০ প্রার্থীর মৌখিক পরীক্ষা শেষে গত ২০ আগস্ট গভীররাতে নির্বাচিত ১৬ জনের তালিকা প্রকাশ করা হয়। এরপর ২৪ আগস্ট তাঁদের নিয়োগপত্র দেওয়া হয়।

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিয়োগপ্রাপ্তদের বেশির ভাগই জাতীয় পরিচয়পত্রের জন্ম তারিখ গোপন করে ভুয়া জন্ম নিবন্ধন ও শিক্ষা সনদ দাখিল করেন। এ ক্ষেত্রে প্রার্থীদের কাছ থেকে পাঁচ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়েছে। যোগ্যতাসম্পন্ন চাকরিপ্রত্যাশীরা বলছেন, জেলা প্রশাসকের বাসায় কর্মরত কর্মচারীদের আত্মীয়-স্বজন এবং যাঁরা তাঁর ব্যক্তিগত কাজ করতেন, মূলত তাঁরাই নিয়োগ পেয়েছেন। এর মধ্যে জেলা প্রশাসকের বাসার বাবুর্চি বিল্লাল হোসেনের বড় বোন মোছা. সাবিনা ইয়াসমিনও আছেন। ২০০৭ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত ভোটার তালিকায় সাবিনার ঠিকানা কুমারখালীর সাঁওতা গ্রাম উল্লেখ করা আছে। তাঁর ভোটার নম্বর ৫০০৮৮৮৫৯৩৯১৬, জন্ম তারিখ ১০ জুন ১৯৮১। সেই হিসাবে আবেদনের সময় তাঁর বয়স ছিল ৩৮ বছর চার মাস। সম্প্রতি সাবিনা জালিয়াতচক্রের মাধ্যমে ‘তথ্য সংশোধন করে’ নাম মোছা. সাবিনা ইয়াসমিন বেলী ও জন্ম তারিখ ১ জুন ১৯৯২ করেছেন। তবে এনআইডির পোর্টালে তথ্য সংশোধনের সপক্ষে কোনো নথি বা আবেদন সংরক্ষিত নেই।

জানতে চাইলে কুমারখালী উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা শিরিনা আকতার বানু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য সংশোধন করতে হলে উপজেলা নির্বাচন অফিসে আবেদন করতে হয়। কিন্তু আমাদের কাছে সাবিনা এমন কোনো আবেদন করেননি। কিভাবে তথ্য বদলে গেল, তা আমাদের বোধগম্য নয়।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৯৮ সালে সাঁওতা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন সাবিনা ইয়াসমিন। কিন্তু বয়স কম দেখাতে গিয়ে তিনি লাহিনীপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ২০০৫ সালে অষ্টম শ্রেণি পাস করেছেন বলে শিক্ষা সনদ দাখিল করেছেন। ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষক কলিম উদ্দিন বলেন, ‘ওই সনদ আমাদের স্কুলের না।’

সাবিনাকে কুমারখালীর বাগুলাট ইউনিয়ন ভূমি অফিসে পদায়ন করা হয়েছে। সার্বিক বিষয়ে কথা বলতে বৃহস্পতিবার তাঁর মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া মেলেনি। তবে সাবিনার ছোট ভাই কুষ্টিয়া সার্কিট হাউসের বাবুর্চি বর্তমানে ডিসির বাংলোয় কর্মরত বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘ডিসি কাকে কিভাবে নিয়োগ দেবেন, তা আপনার জেনে কী লাভ?’ এই বলেই তিনি ফোন কেটে দেন।

আর কুমারখালীর শিলাইদহ ইউনিয়ন ভূমি অফিসে পদায়ন করা হয়েছে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত মোছা. নাসরিন আক্তারকে। তিনি জেলা প্রশাসকের বাসার কর্মচারী কামরুল ইসলামের চাচাতো বোন। জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য অনুযায়ী, নাসরিন পাবনার সুজানগর উপজেলার হাটখালী ইউনিয়নের বাসিন্দা। তাঁর এনআইডি নম্বর ১৯৯১৭৬১৮৩২৮০০০২২১। স্বামীর নাম মো. তরিকুল ইসলাম সুজন। জানা গেছে, হাটখালীর বাসিন্দা সুজন বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকেন। ২০১১ সাল থেকে হাটখালীর শ্বশুরবাড়িতে থাকেন নাসরিন। অন্য জেলার বাসিন্দা হয়েও তিনি নিয়োগ পাওয়ায় কুষ্টিয়ার বাসিন্দারা সমালোচনা শুরু করেন। এ পরিস্থিতিতে গত ২৯ অক্টোবর তিনি স্থায়ী ঠিকানা পরিবর্তনের জন্য কুমারখালী উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা বরাবর আবেদন করেন। হাতে লেখা ওই আবেদনে পৈতৃক সূত্রে তিনি কুষ্টিয়ার স্থায়ী বাসিন্দা হতে চান বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর বাবার বাড়ি কুমারখালীর চাপড়া ইউনিয়নের লাহিনীপাড়া গ্রামে। এই আবেদন গ্রহণ করাতে নানামুখী চাপ দিচ্ছেন নাসরিন।

নির্বাচন কর্মকর্তা শিরিনা আকতার বলেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব বিল্লাল হোসাইন পরিচয়ে নাসরিনের আবেদন গ্রহণ করতে বেশ কয়েকবার হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

কালের কণ্ঠ’র সংগৃহীত নাসরিনের আবেদনপত্রে যুগ্ম সচিব বিল্লাল হোসাইন পরিচয়ে একটি মুঠোফোন নম্বর পাওয়া গেছে। পরিচয় নিশ্চিত হতে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কয়েকবার ফোন করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। নাসরিনও ফোন ধরেননি।

নাসরিনের চাচাতো ভাই সার্কিট হাউসের চৌকিদার বর্তমানে ডিসির বাংলোয় কর্মরত কামরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কালের কণ্ঠ’র নাম শুনেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। বলেন, ‘আমাকে ফোন দেবার সাহস আপনি কোথা থেকে পেলেন? কে আপনাকে আমার নম্বর দিয়েছে?’ এই বলে ফোন কেটে দেন।

নিয়োগপ্রাপ্তদের আরেকজন মো. শরিফুল ইসলাম। তিনি অস্থায়ী ভিত্তিতে জেলা প্রশাসনে উমেদার ছিলেন। ঘুষ গ্রহণের কারণে ২০১৪ সালে তৎকালীন ডিসি সৈয়দ বেলাল হোসেন তাঁকে সরিয়ে দেন। বর্তমান জেলা প্রশাসক কুষ্টিয়ায় যোগদানের কিছুদিন পর এই শরিফুলকে ফের ওমেদার হিসেবে বহাল করা হয়। শরিফুল গড়াই নদীর জিলাপিতলা বালিরঘাটে জেলা প্রশাসনের নামে চাঁদাবাজি করতেন। তিনি কুষ্টিয়া পৌর এলাকার লাহিনী গ্রামের মাহাতাব শেখের ছেলে। তাঁর ভোটার নম্বর ৫০০৭৭৯২৩৪৩৮৩; জন্ম তারিখ ২৬ নভেম্বর ১৯৮৬। অফিস সহায়ক হিসেবে আবেদনের সময় শরিফুলের বয়স ছিল ৩২ বছর ১০ মাস ১৪ দিন। তিনি ২০১৬ সালে বয়স সংশোধনের আবেদন করে প্রত্যাখ্যাত হন। সম্প্রতি শরিফুল আবারও জন্ম সাল সংশোধনের আবেদন করেছেন, যা নির্বাচন কমিশনের সার্ভারে সংরক্ষিত রয়েছে।

যোগাযোগ করা হলে কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মুহাম্মদ আবু আনছার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভোটার তালিকা থেকে কারো নামের একটি বর্ণও যদি পরিবর্তন করতে হয়, তাহলে কারণসহ আবেদন এবং সঙ্গে সাপোর্টিং পেপার লাগে এবং তাঁর সব কিছু সার্ভারে সংরক্ষিত থাকে। ডিসি অফিসে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত মো. শরিফুল ইসলাম জন্ম তারিখ সংশোধনের জন্য ২০১৬ সালে আবেদন করলে তা বাতিল করা হয়। কয়েক দিন আগে তিনি আবারও একই আবেদন করেছেন। এসব নথি সার্ভারে সংরক্ষিত আছে, কিন্তু সাবিনার কোনো নথিই সার্ভারে নেই।’

সাবিনা, নাসরিন, শরিফুলদের মতো নিয়োগপ্রাপ্ত অন্যরাও মোটা অঙ্কের অর্থ খরচ করে এনআইডি সংশোধনের চেষ্টা করছেন। তাঁদের বেশির ভাগেরই শিক্ষা সনদ ভুয়া বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। আবেদনের সময় তাঁরা এনআইডি দাখিল না করে ভুয়া জন্ম সনদ দাখিল করেন। নিয়োগপ্রাপ্তের তালিকায় নিয়োগ কমিটির আহ্বায়ক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ওবায়দুর রহমানের বাসার কাজের ছেলে হেলাল, ডিসির বাসার কর্মচারী কামরুলের আপন ভাই মিলন হোসেনও আছেন।

নিয়োগবিধি ভঙ্গ করে অন্য জেলার বাসিন্দা এবং ত্রিশোর্ধ্বদের কিভাবে নিয়োগ দেওয়া হলো—এ প্রশ্নের জবাবে নিয়োগ কমিটির আহ্বায়ক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ওবায়দুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মৌখিক পরীক্ষার সময় আমরা তো পরীক্ষার্থীদের কাগজপত্র যাচাই করেই নিয়োগ দিয়েছিলাম। তখন তো এগুলো আমাদের নজরে আসেনি। এখন কেন এগুলো নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, আমি তা বুঝতে পারছি না।’

প্রসঙ্গত, ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সাধারণ শাখায় ১৬ জন অফিস সহায়ক নিয়োগেও অনিয়ম ও বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছিল।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস

বাংলাদেশে

আক্রান্ত
সুস্থ
মৃত্যু

বিশ্বে

আক্রান্ত
সুস্থ
মৃত্যু
সর্বশেষ (গত ২৪ ঘন্টার রিপোর্ট)
আক্রান্ত
মৃত্যু
সুস্থ
পরীক্ষা
সর্বমোট

একাত্তর পত্রিকার প্রতিনিধি সভা

x