মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ১০:০৪ অপরাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক:
গাড়িতে বসে স্টিয়ারিং ধরতে পারলেই পাস। দিতে হয় না পরীক্ষা। কয়েকদিন অপেক্ষা। তারপর মেলে লাইসেন্স। সেই লাইসেন্স নিয়ে এসব চালক দাবিয়ে বেড়ায় সড়কে। আবার ঘটেও দুর্ঘটনা। লাইসেন্স পাওয়া এমন শর্টকার্ট পরীক্ষার চিত্র যেন প্রতিদিনকার।
বুধবার (২২ ডিসেম্বর) ২ টার দিকে সরেজমিনে কবিতা চত্বর গিয়ে দেখা মেলে দালাল দিয়ে লাইসেন্স নেয়ার অভিনব কৌশল। ওই সময় লাইসেন্সের পরীক্ষা দিতে আসেন পুলিশ, সেনাবাহিনী, এপিবিএন, পাবলিকসহ বিভিন্ন পেশা শ্রেণীর মানুষ। সেখানে দেখা নাম না জানা একজন (দালাল) একজন সাব ইন্সপেক্টর থেকে ১০০ টাকা নেন।
এসময় টাকার বিষয়ে দালালকে প্রশ্ন করা হয়। উত্তরে বলেন, আমরা বছর-ছয় মাসে এমন সুযোগ পাই। অল্পস্বল্প টাকা না দিলে কিভাবে সংসার চলবে?
কিছুক্ষণ পরপরই দেখা মেলে একজনের নিকট থেকে ৫০০ টাকা নিচ্ছেন। কিন্তু এভাবে কক্সবাজারে বিআরটি এর লাইসেন্সপ্রত্যাশীদের পরীক্ষা নেয়া হয়। একদল সাংবাদিক সরেজমিনে পরীক্ষার্থী বেশে দেখা যায়, কক্সবাজার সার্কিট হাউসের ভেতরে পরীক্ষার্থীরা প্রথমটি লিখিত পরীক্ষা দেয়। দ্বিতীয়টি মৌখিক এবং তৃতীয়টি কবিতা চত্বরে গাড়ি/মোটরসাইকেল চালানোর ব্যবহারিক পরীক্ষা। লিখিত পরীক্ষা মোট ২০ নম্বরের। এতে ১২ পেলে পাস। ১০০ নম্বর করে মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষা হয়। মৌখিকে পাস নম্বর ৭৫। ব্যবহারিকে ১০০ তে ১০০ পেতে হয়। তবে কবিতা চত্বরে গিয়ে দেখা গেল উল্টো চিত্র। দালালের শরণাপন্ন হলে গাড়ি চালাতে না পারলেও পাস নম্বর পাওয়া যায়।
কবিতা চত্বরে ব্যবহারিক পরীক্ষার জন্য ২ টি গাড়ি রয়েছে। পরীক্ষা দিতে গাড়ির ভাড়া দিতে হয় ১০০ থেকে ৫০০ টাকা। খোলা মাঠে লাল পতাকা বসানো। একজন পরীক্ষার্থীকে গাড়িটি ব্যাক গিয়ারে নিয়ে (পেছনের দিকে) পার্কিং করতে হয়। ব্যাকে নেয়ার সময় গাড়ির সঙ্গে লেগে কোনো পতাকা পড়ে গেলে পরীক্ষায় ফেল। তবে এক ঘণ্টার পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, দালালরা ১০০-২০০ জনের লাইন ভেদ করে। তাদের ‘গ্রাহককে’ ব্যবহারিক পরীক্ষা দেয়াচ্ছেন। অন্যরা ব্যবহারিক পরীক্ষায় পতাকা ফেলে দিলে তাদের ফেল করিয়ে দেয়া হচ্ছে। অথচ দালালদের সঙ্গীরা গাড়িতে বসে পাঁচ সেকেন্ডের জন্য স্টিয়ারিং ধরেই পাস করে যাচ্ছেন। এমন বেশ কয়েকজনের দেখা মেলে। এছাড়া এক ঘণ্টার পর্যবেক্ষণে দালাল ছাড়া আগতদের মধ্যে মাত্র ১০ জনকে পাস করতে দেখা যায়। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের একজন এক বছর তিন মাস এবং আরেকজন এক ৮ মাস আগে আবেদন করেছিলেন। যারা দালাল ছাড়া সরাসরি গিয়ে পরীক্ষা দেন তাদের অনেকেই ফেল করেন। পরে তারা দালালের শরণাপন্ন হন।
গতকাল পরীক্ষায় ফেল করা আবেদনকারীদের সঙ্গে সেসব কবিতা চত্বরের ঝাউ বাগানের ভেতরে পাস করানোর ‘চুক্তি’ করেন দালালরা। সাধারণত একটি ড্রাইভিং লাইসেন্স নেয়ার জন্য প্রাথমিকভাবে শিক্ষানবিশ লাইসেন্স নিতে হয়। এতে খরচ হয় ৩৪৫ টাকা। পরবর্তীতে পেশাদার চালকদের জন্য এক হাজার ৪৩৮ টাকা এবং অপেশাদার চালকদের জন্য দুই হাজার ৩০০ টাকা ফি দিয়ে পরীক্ষা দিতে হয়। অপেশাদারদের জন্য সবমিলে দুই হাজার ৬৪৫ টাকা লাগার কথা। তবে একাধিক দালালের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা মাত্র দুই মাসের মধ্যে সব ধাপ পার করিয়ে লাইসেন্স নিয়ে দেবেন। লাইসেন্সের আবেদনকারীকে শুধুমাত্র পরীক্ষার জন্য সশরীরে হাজির হতে হয়। বাকিটা তারাই দেখেন। এজন্য তারা ৮ থেকে ১৪ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়ে থাকেন।
সম্প্রতি দালালের মাধ্যমে ১২ হাজার টাকা দিয়ে লাইসেন্স নেয়া সাজেদ হোসেন (ছদ্মনাম) সাংবাদিকদের বলেন, আমি কক্সবাজার এসে প্রথমে মোটরসাইকেল এবং পরবর্তীতে গাড়ির জন্য আবেদন করি।মোটরসাইকেলের লাইসেন্সের সময় আমাকে ব্যবহারিক পরীক্ষায় একটিতে উপস্থিত থাকতে হবে।আমি ‘জিগজ্যাগ’ করেছিলাম তখন ওনি( দালাল)আমাকে বল্ল আঁকাবাঁকা সড়ক পার হতে বলা হয়। তবে পরীক্ষার সময় মোটরসাইকেল থেকে মাটিতে পা নামানো যাবে না। তবে আমি যাকে (দালাল) টাকা দিয়েছিলাম সে বলেছিল সমস্যা নাই। আমি পাস করেছিলাম। মোটরসাইকেলের লাইসেন্স পাওয়ার কয়েক বছর পর আমি সেটার সঙ্গে হালকা যানের (গাড়ি) জন্য আবেদন করে ওই দালালের সাথে আবারো চুক্তি করি। পরবর্তীতে আমার আর হালকা যানের সেই লাইসেন্স করে আমাকে বাসায় পৌঁছে দেয়।
এ বিষয় নিয়ে কক্সবাজার বিআরটি পরিদর্শক আরিফুল ইসলামের মুঠো ফোনে যোগাযোগ করতে চাইলে তার ব্যবহৃত ফোন নাম্বারটি বন্ধ পাওয়া যায়।