বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬, ০৬:৫২ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির চূড়ান্ত মনোনয়ন পেলেন শামীম আরা স্বপ্না ১২ কেজি এলপিজির দাম বাড়ল ২১২ টাকা দেশে মজুদ গ্যাস দিয়ে ১২ বছর চলবে : জ্বালানিমন্ত্রী রামু থানা পুলিশের বিশেষ অভিযানে পরোয়ানাভুক্ত ৫ আসামিসহ ১৫ জন গ্রেফতার ঈদগাঁও – ঈদগড় সড়কের গহীন পাহাড়ে পুলিশের ৪ ঘণ্টার দুঃসাহসিক অভিযান উখিয়া -টেকনাফ সড়কের মরিচ্যা চেকপোস্টে বিজিবির অভিযান: ১৫ হাজারের বেশি ইয়াবাসহ নারী-পুরুষ আটক কক্সবাজার সদর থানা পুলিশের ২৪ ঘন্টার চিরুনী অভিযানে ডাকাত ও ছিনতাইকারীসহ গ্রেফতার ১৫ রামু থানা পুলিশের অভিযানে ১ লক্ষ ৪ হাজার) পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার সাংবাদিক সংসদ কক্সবাজার’র আলোচনা সভা ও ইফতার মাহফিল সম্পন্ন নাইক্ষ্যংছড়িতে বিজিবির উপর হামলায় ৩৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা !!

পিএমখালীতে চ্যাঞ্চল্যকর মোর্শেদ হত্যার অর্থ যোগানদাতা হুন্ডি বজল

নিজস্ব প্রতিবেদক:
ইফতার পর্যন্ত প্রাণভিক্ষা চেয়েও নির্মমভাবে খুনের শিকার হন কক্সবাজার সদরের পিএমখালীর প্রতিবাদী যুবক মোর্শেদ। গত ৭ এপ্রিল ঘটনার পর থেকে ওই হত্যাকান্ডে জড়িত এখন পর্যন্ত ৭জনকে গ্রেফতার হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে এজাহার নামীয় অধিকাংশ শীর্ষ আসামী। পলাতক এসব অভিযুক্তরা সিংহভাগই সরকারদলীয় নেতাকর্মী।
অন্যদিকে মোর্শেদ হত্যার পরপরই জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমগুলোতে প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত শিরোনাম হয় ‘উপরের নির্দেশে তাকে খুন করা হচ্ছে’। ফলে মোর্শেদ হত্যায় জড়িত প্রভাবশালী আসামীদের গ্রেফতারে ধীরগতিতে ক্ষোভ এবং কে বা কারা সেই উপরের নির্দেশদাতা তা জানতে মরিয়া হয়ে উঠেছে পিএমখালী সহ জেলার সচেতন মহল।
এদিকে মোর্শেদ হত্যাকান্ডে জড়িত খুনীদের নেপথ্যের শক্তি এবং ইন্ধনদাতাদের ব্যাপারে অনুসন্ধান চালালে জানা যায়, অভিযুক্তরা পিএমখালী এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে রেখেছে। একাধিক চক্র গড়ে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, মাদক পাচার, ফসলি মাঠি লুট, প্রতিবন্ধী কিশোরী ধর্ষণসহ এমন কোনো অপরাধ নেই তারা সংঘটিত করেনি। আর এসবের নেপথ্যে ইন্ধনদাতা হিসেবে যাদের নাম মুখে মুখে উঠে এসেছে তাদের মধ্যে একজন হুন্ডি সম্রাট বজল আহমেদ এবং অপরজন হলেন কথিত পাওয়ার আলীর ভাই আব্বাস। এছাড়াও এই হত্যা মামলায় আসামী হওয়া দুই ভাইকে জামিনে ছাড়িয়ে নিতে কোটি টাকার মিশনে নেমেছে আব্বাস।
বিশেষ করে কয়েকজন আসামী গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে স্থানীয় ভুক্তভোগীরা সাহস করে মুখ খোলতে শুরু করেছেন। তাদের বয়ানে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে হত্যাকান্ডে জড়িতদের নানা কুকীর্তি ও কালো অধ্যায়ের ফিরিস্তি।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য মতে, ওই একই এলাকার শুক্কুর সওদাগরের ছেলে চিহ্নিত ভূমিদস্যু ও হুন্ডি ব্যবসায়ী বজল আহমদের দেওয়া ছক অনুযায়ী পরিকল্পিত ভাবে খুন করা হয় মোর্শেদকে। সেদিন ঘটনাস্থলে স্বশরীরে উপস্থিত না থাকলেও হত্যাকান্ডে জড়িত সিন্ডিকেটটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও ছকদাতা হলেন এই বজল আহমদ। কারণ প্রবাস ফেরত প্রতিবাদী মোর্শেদ হুন্ডি সম্রাট বজল নিয়ন্ত্রিত আলাল মালেক সিন্ডিকেটটির প্রতিটি কাজে বাঁধা হয়ে দাঁড়াচ্ছিলেন এবং তাদের অপরাধ সম্রাজ্য ভেঙে দিতে নিয়মিত তৎপর ছিলেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়- ২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে হুন্ডি সম্রাট বজল আহমদের পৃষ্ঠপোষকতায় পিএমখালী এলাকায় গড়ে উঠে ভয়ঙ্কর আলাল-মালেক সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটে রয়েছে জয়নাল, মালেক, আলাল এবং মাদু করিম সহ চারজন। আলাল ও মালেক উভয়ে সরকারদলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় এবং পদবীধারী নেতা। যদিও ঘটনার পর বহিস্কার হয়েছেন আলাল-মালেক সহ এই চারজন। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের নেতা হওয়ায় তাদের বিভিন্ন অপকর্মে ব্যবহার এবং বিপুল পরিমাণ টাকা দিয়ে পৃষ্ঠপোষকতা করতেন বজল আহমদ।
নিজেকে এলজিইডিসহ একাধিক সরকারী প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদার হিসেবে পরিচয় দিলেও বজল আহমদ মূলত একজন হুন্ডি ব্যবসায়ী, ভূমিদস্যু এবং পরিবেশ বিধ্বংসী ইটভাটা ব্যবসায়ী। মায়াশী নামে তার আরও এক ভাই রয়েছে যে হুন্ডি মাদক পাচার করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়েছিলো।
আরও জানা যায়, গড়ে তুলা ক্যাডার বাহিনী আলাল-মালেক সিন্ডিকেটকে দিয়ে ২০১৮ সালে পিএমখালীর মাইজপাড়ায় ১৬ একর ৮০শতক জমি অবৈধ ভাবে দখল করে নেয় বজল আহমদ। এই কাজ নিখুঁত ভাবে করতে বজল আহমেদ আলাল-মালেক সিন্ডিকেটকে মজুরি হিসেবে দেন ১কোটি ৪০ লক্ষ টাকা। যার অর্ধেক টাকা বুঝে নেন তৎকালীন থানার দালাল এবং কথিত পাওয়ার আলীর ভাই মাদু করিম।
এই টাকা মাদু করিম তৎকালীন প্রশাসনকে ম্যানেজ করতে ব্যবহার করে বলে জানা যায়। আর বাকী অর্ধেক টাকা সিন্ডিকেটের চার জনের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা হয়। এভাবে টাকা ও ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে সে বছর উক্ত জমির কমপক্ষে দুই শতাধিক অসহায় মালিককে বিতাড়িত করে, বাস্তুচ্যুত করে। আর্থিক ও ক্ষমতার দিক থেকে দুর্বল হওয়ায় এসব প্রকৃত জমির মালিক এখন কেউ কেউ এলাকা ছাড়া হয়েছেন আবার কেউ কেউ খড়কুটো ধরে জমি ফেরত পেতে প্রাণপণে লড়ছেন আদালতে দ্বারে দ্বারে। এদের মধ্যে একজন হলেন- দৌলত হাজীর ওয়ারিশগণ। তারা এখনও এই জমি ফিরে পেতে আদালতে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানা যায়।
স্থানীয়দের দেওয়া আরও একটি তথ্য মতে, পিএমখালী ইউনিয়নে শুধুমাত্র সরকারি ও ব্যাক্তি মালিকানাধীন জমি দখল করতে স্থানীয় সরকার দলীয় নেতা কর্মীদের ব্যবহার করে গ্রীণ সোসাইটি নামের একটি সংগঠন গঠন করে কক্সবাজারের হুন্ডি সম্রাট বজল। সংগঠনটি গঠনের দুদিনের মধ্যে পিএমখালী ইউনিয়ন পরিষদের সাথে লাগোয়া সরকারি ও হতদরিদ্র লোকজনের ৪২ কানি জমি দখল করে নেয় বজল।
তার বিনিময়ে সংগঠনটিতে ৪০ লাখ টাকা দেন। এরপর থেকে সংগঠনটির অর্থ যোগানদাতা হিসেবে বজল প্রধান পৃষ্টপোষক ছিলেন। তার অধিনে থাকা গ্রীণ সোসাইটি একের পর এক জমি দখল করা শুরু করে। সেখান থেকে মোটা অংকের একটি অংশ যেতো বজলের কাছে। ইতিমধ্যে পিএমখালীসহ আশেপাশের প্রায় ৪০ টির মত জমি দখল-বেদখলে কাজ করে। বিচারের নামে প্রহসন, মামলার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়সহ কয়েকশ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন সংগঠনটি। যার অর্ধেক টাকা নিতেন বজল।
সমাজে নিজেকে টিকাদার দাবী করলেও হুন্ডি এবং গ্রীণ সোসাইটির প্রধান থেকে হাতিয়ে নেন কয়েকশ কোটি টাকা। মাদক বিরোধী অভিযান শুরু হলে বজল কিছুদিন গা ঢাকা দেন। অভিযোগ রয়েছে, উখিয়া-টেকনাফের কয়েকশ মাদক সম্রাটের হাজার হাজার কোটি টাকা বজলের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করেন। বজলের আশ্রয় পশ্রয়ে মোর্শেদ হত্যা মামলায় অভিযুক্ত বহিষ্কৃত নেতারা বেপরোয়া হয়ে উঠে।
স্থানীয়দের আরও একটি বর্ণনায় জানা যায়, কিছুদিন আগে বজলের ইটভাটায় টপ সয়েল পাচারে বাঁধা দেয় মোর্শেদ। মাইজপাড়ার নিকটস্থ পাতলী খাল খনন করে আলাল মালেক সিন্ডিকেট সম্প্রতি বজলের ইটভাটায় মাঠি সরবরাহ করে। উক্ত খননস্থলের নির্দিষ্ট একটি অংশ হত্যাকান্ডের শিকার মোর্শেদের মালিকানাধীন ছিলো। ফলে সে সময় মোর্শেদ আলাল-মালেক গ্যাংকে খননকৃত উক্ত মাটি বজলের ইট ভাটায় দিতে বাঁধা দেয় এবং সেই মাটি নিয়ে স্থানীয় মসজিদের কবরস্থান ভরাট করে মোর্শেদ।
এঘটনার পর থেকেই মূলত বজল এবং তার নিয়ন্ত্রিত সিন্ডিকেট মোর্শেদের উপর তীক্ষ্ম নজর রাখতে শুরু করে। এর আগে বজলের ইটভাটায় শতাধিক শ্রমিকের ন্যায্য মজুরী আদায় সংক্রান্ত একটি বিষয়েও মোর্শেদ ভূমিকা রাখে।
এই ঘটনার বর্ণনায় জানা যায়, বজলের ইটভাটায় কর্মরত স্থানীয় শতাধিক শ্রমিককে শ্রম আইন লঙ্ঘন করে ৪ মাসের কথা বলে ৬মাস খাটায়। অতিরিক্তি দুই মাসের মজুরি না দিয়েই নয়ছয় করে বিদায় করে দেয়। এবিষয়টি শ্রমিকরা মোর্শেদকে জানালে সে প্রতিবাদ করে এবং উক্ত টাকা শ্রমিকদের দিতে বাধ্য করে। এবারও প্রায় ১৫ দিনের মজুরী আটকে রেখে শতাধিক শ্রমিককে জিম্মি করে রেখেছে খবর পাওয়া গেছে।
ভাবে করে প্রবাসফেরত মোর্শেদ অতিদ্রুত সময়ে বজল ও তার পালিত সিন্ডিকেটের ক্ষোভ ও রোষাণলের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এক সময়ের অর্থবিত্তহীন আলাল মালেকরা বজল আহমদের মতো পৃষ্ঠপোষক পেয়ে এমনই বেপরোয়া হয়ে উঠবে কে জানতো। বজলের হুন্ডি ও জমি দখল নিয়ে আগামী পর্ব থাকছে।
এদিকে অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসা তথ্যগুলো জানিয়ে বজল আহমদের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি প্রতিবেদককে বলেন- “মোর্শেদকে বিএনপির লোকজন মেরেছে। যারা মেরেছে তারা তো গ্রেফতার হয়েছে। এখানে আলাল-মালেকের সম্পৃক্ততার কথা আসছে কেনো।” এভাবে প্রতিবেদকের কাছে পাল্টা প্রশ্নও করেন বজল।
এভাবে কথোপকথনের এক পর্যায়ে তিনি দাবী করেন- দখলকৃত জমিটি তার নিজের এবং এও স্বীকার করেন- উক্ত জমি দখলের সময় আলাল-মালেক সিন্ডিকেটকে ‘কিছু হাত খরচ’ দিয়েছেন। এছাড়াও মোর্শেদ হত্যায় ছক আঁকা এবং উল্লেখিত দখলকৃত জমির প্রকৃত মালিকানা প্রমাণে তিনি কাগজপত্র সহ সামনাসামনি কথা বলতে সময় চান। কিন্তু পরবর্তীতে উপর্যুপরি যোগাযোগ করেও সাড়া না দেওয়ায় বজল আহমদের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ডিসি৭১/এমইউনয়ন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *