শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬, ০১:৫২ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির চূড়ান্ত মনোনয়ন পেলেন শামীম আরা স্বপ্না ১২ কেজি এলপিজির দাম বাড়ল ২১২ টাকা দেশে মজুদ গ্যাস দিয়ে ১২ বছর চলবে : জ্বালানিমন্ত্রী রামু থানা পুলিশের বিশেষ অভিযানে পরোয়ানাভুক্ত ৫ আসামিসহ ১৫ জন গ্রেফতার ঈদগাঁও – ঈদগড় সড়কের গহীন পাহাড়ে পুলিশের ৪ ঘণ্টার দুঃসাহসিক অভিযান উখিয়া -টেকনাফ সড়কের মরিচ্যা চেকপোস্টে বিজিবির অভিযান: ১৫ হাজারের বেশি ইয়াবাসহ নারী-পুরুষ আটক কক্সবাজার সদর থানা পুলিশের ২৪ ঘন্টার চিরুনী অভিযানে ডাকাত ও ছিনতাইকারীসহ গ্রেফতার ১৫ রামু থানা পুলিশের অভিযানে ১ লক্ষ ৪ হাজার) পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার সাংবাদিক সংসদ কক্সবাজার’র আলোচনা সভা ও ইফতার মাহফিল সম্পন্ন নাইক্ষ্যংছড়িতে বিজিবির উপর হামলায় ৩৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা !!

কক্সবাজার বিমানবন্দরে অবৈধদের অবাধ বিচরণ

ঘটতে পারে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা : টিনশেড গুদামঘরকে হ্যাঙ্গার বানিয়ে রাখা হচ্ছে উড়োজাহাজের যন্ত্রপাতি

বিশেষ প্রতিবেদক:

কক্সবাজার বিমানবন্দর দেশের অতি স্পর্শকাতর একটি স্থাপনা হলেও এর নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত ঢিলেঢালা। নিরাপত্তা পাস ছাড়াই এখানে আসা-যাওয়া করা যায় যখন খুশি। উড়োজাহাজ মেরামত ও মেইনটেন্যান্সের জন্য বিমান বন্দরটিতে নেই যথোপযুক্ত কোনো হ্যাঙ্গার। বৈধ ভিসা ও বেবিচকের অনুমোদন ছাড়াই বিদেশিরা এই বিমানবন্দরে প্রবেশ ও উড়োজাহাজ মেইনটেন্যান্সের মতো স্পর্শকাতর কাজ করছে। এমনকি বিমানবন্দরে প্রবেশে তাদের নেই কোনো বৈধ পাস। নেই এয়ারক্রাফট মেইনটেন্যান্সের আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেটও। সম্প্রতি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) একটি উচ্চপর্যায়ের সার্ভিলেন্স টিম কক্সবাজার বিমানবন্দরে ঝটিকা অভিযানে গিয়ে এই চিত্র দেখতে পায়।

জানা গেছে, ইতোমধ্যেই বিষয়টি বেবিচকের উচ্চপর্যায়ের একটি সার্ভিলেন্স টিম তাৎক্ষণিকভাবে সংস্থাটির শীর্ষ পর্যায়ে অবহিত করেন। এরপর বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম মফিদুর রহমান এরই মধ্যে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (বিডা) ও ডিপার্টমেন্ট অব ইমিগ্রেশন অ্যান্ড পাসপোর্টকে চিঠি দিয়েছেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, কক্সবাজার বিমানবন্দরের বাইরে টিনশেড গুদামঘরকে হ্যাঙ্গার বানিয়ে রাখা হচ্ছে উড়োজাহাজ মেরামতের মূল্যবান যন্ত্রপাতি ও স্পেয়ারপার্টস। এলোমেলো ও বিশৃঙ্খলভাবে রাখা যন্ত্রপাতিগুলো দেখলে মনে হয় এটা যেন কোনো ভাঙরির দোকান। ফ্রি স্টাইলে চলছে উড়োজাহাজ মেরামত ও মেইনটেন্যান্স ব্যবস্থা। মেরামতের জন্য নেই যথোপযুক্ত কোনো হ্যাঙ্গার। প্রকাশ্যে উন্মুক্ত আকাশের নিচে খোলা হচ্ছে উড়োজাহাজের যন্ত্রপাতি। এসব যন্ত্রপাতি আবার রাখা হচ্ছে অনুমোদনহীন হ্যাঙ্গার বা গুদামে।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, বিদেশি ইঞ্জিনিয়ারদের এভাবে বিমানবন্দরে বৈধ ভিসা, প্রবেশের বৈধ পাস ও বেবিচকের অনুমোদন ছাড়া স্পর্শকাতর জোনে প্রবেশ দেশের নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি। যে কোনো বিমানবন্দর একটি কেপিআই (কি পয়েন্ট ইন্সটলেশন) স্থাপনা। এর ফলে চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে কক্সবাজার বিমানবন্দরের ফ্লাইট অপারেশন। এখনই এ ব্যাপারে সংশ্লিস্ট কর্তৃপক্ষ যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে যে কোনো সময় ঘটতে পারে চরম অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা।

ফ্লাইট স্ট্যান্ডার্ড রেগুলেশন্স বিভাগের পরিচালক মো. মুকিত উল আলম মিয়া স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়েছে, পাসের মেয়াদ ও কাজের অনুমতি না থাকা সত্ত্বেও বিদেশিদের বিমানবন্দরে প্রবেশ বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি। বেবিচকের সদস্য পরিচালনা ও পরিকল্পনাকে দেয়া ওই চিঠিতে তিনি দেশের বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তার স্বার্থে এ ধরনের পাস ইস্যু ও মেয়াদবিহীন পাস নিয়ে বিদেশিদের প্রবেশের বিষয়টি তদন্ত করার অনুরোধ জানান।

বেবিচকের ফ্লাইট স্ট্যান্ডার্ড রেগুলেশনন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বেসরকারি এয়ারলাইন্স ট্রু এভিয়েশন এয়ারলাইন্স ও বিসমিল্লাহ এয়ারলাইন্স নামের দুটি বিমান সংস্থা মূলত এজন্য দায়ী। গত ১৪ মে বেবিচকের দুইজন পরিদর্শক কক্সবাজার বিমানবন্দরে ঝটিকা পরিদর্শনে গিয়ে দুই এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজগুলোর এই চিত্র দেখতে পান। সরেজমিন পরিদর্শনকালে তারা দেখেন বিমানবন্দরে খোলা আকাশের নিচে দুইজন বিদেশি ইঞ্জিনিয়ার ট্রু এভিয়েশনের একটি উড়োজাহাজ মেরামত করছেন। কোনো ধরনের আন্তর্জাতিক আইন-কানুন না মেনে এভাবে দুই বিদেশিকে উড়োজাহাজ মেরামত করতে দেখে পরিদর্শকরা হতবাক হন। বেবিচকের পরিদর্শকদের দেখে কর্মরত বিদেশি ইঞ্জিনিয়ারও হতম্ভব হয়ে পড়েন। পরিদর্শকরা কর্মরত বিদেশি দুইজনের কাছে বিমানবন্দরে প্রবেশের যে পাস দেখতে পান তা ছিল মেয়াদোত্তীর্ণ। ১৭ দিন আগে তাদের পাসের মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে। নেই ভিসার মেয়াদও। শেষ হয়ে গেছে অনেক আগে। যে ভিসা নিয়ে তারা বাংলাদেশে এসেছিলেন সেখানে উল্লেখ রয়েছে, এ ধরনের ভিসায় তারা বেতনে কিংবা বিনা বেতনে কোনোভাবে বাংলাদেশে কাজ (চাকরি) করতে পারবেন না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নিয়ম অনুযায়ী কোনো বিদেশি ইঞ্জিনিয়ার কিংবা পাইলট বাংলাদেশি কোনো রেজিস্টার্ড এয়ারক্রাফটে কাজ করতে বা এয়ারক্রাফট চালাতে হলে সিভিল এভিয়েশনের ফ্লাইট স্ট্যান্ডার্ড রেগুলেশন বিভাগের অনুমতি নিতে হবে। তবে কক্সবাজার বিমানবন্দরে দুই বিদেশির কাছে এ ধরনের কোনো অনুমতিপত্র ছিল না। বেবিচকের অনুমতি ছাড়া কীভাবে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বিদেশিদের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি এবং পাস দিল তা নিয়ে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম নিয়েও।

এ প্রসঙ্গে কক্সবাজার বিমানবন্দরের দায়িত্বরত কর্মকর্তা গোলাম মুর্তজা হোসেন বলেন, সাধারণত যারা বিমানবন্দরে কাজ করতে আসেন তাদের ভেলিড ডকুমেন্ট পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তারপর পাস দেয়া হয়। পাসবিহীন কারো বিমানবন্দরে প্রবেশের সুযোগ নেই। বিদেশি কোনো ইঞ্জিনিয়ার পাস ছাড়া বিমানবন্দরে প্রবেশ করেছেন কিনা সেটা তিনি তদন্ত করে দেখবেন বলে জানান।

জানা গেছে, সিভিল এভিয়েশনের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পোনা ব্যবসায়ীদের একটি সিন্ডিকেট মেয়াদোত্তীর্ণ এয়ারক্রাফট নিয়ে এ রুটে ব্যবসা চালাচ্ছে। উড়োজাহাজগুলোর অধিকাংশই ৩০-৩৫ বছরের পুরোনো। উড়োজাহাজগুলোর অধিকাংশ কমপোনেন্ট ও স্পেয়ার পার্টসের মেয়াদ নেই। বিভিন্ন দেশের মেরামত হ্যাঙ্গারে পড়ে থাকা চলাচলের অযোগ্য এয়ারক্রাফট আমদানি করে চক্রটি ঝুঁকিপূর্ণ এই ব্যবসা করছে বলে জানা গেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কক্সবাজার বিমানবন্দরে নন-শিডিউল ফ্লাইটে ঘুষ লেনদেন হয় মার্কিন ডলারে। পোনা বহনকারী এসব ফ্লাইটের শিডিউল পেতে মোটা অঙ্কের টাকার ঘুষ দিতে হয়। মাছের পোনা বহনকারী কার্গো ফ্লাইটগুলোতে ঘুষের রেট আকাশচুম্বী। কারণ এসব ফ্লাইটে পোনার কনটেইনারে গোপনে পাচার হয় ইয়াবাও।

সূত্র মতে, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ সব জেনেও রহস্যজনক কারণে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ উড়োজাহাজগুলো আকাশে ওড়ার অনুমতি দিচ্ছে। বেশ কিছুদিন আগে ডেসটিনি গ্রুপের মালিকানাধীন একটি এয়ারক্রাফটের কমপক্ষে ২৬টি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও সরেজমিন পরিদর্শন করে নো অবজেকশন সার্টিফিকেট (এনওসি) দিয়েছিল সিভিল এভিয়েশনের একটি টিম। পরবর্তী সময়ে ওই ঘটনা ফাঁস হলে ওই এয়ারলাইন্সের এওসি (এয়ার ওয়ার্দিনেস সার্টিফিকেট) বাতিল করা হয়। তারও আগে কক্সবাজার সংলগ্ন সাগরে একটি এয়ারক্রাফট (এএন-২৬) বিধ্বস্ত হয় যার বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ছিল মেয়াদোত্তীর্ণ। উড়োজাহাজটির একটি ইঞ্জিন বছরের অধিকাংশ সময় নষ্ট থাকত। ওই এয়ারক্রাফটির মালিকও ছিল ট্রু এভিয়েশন। এএন-২৬ মডেলের যে উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হয়েছিল সেটি এক সময় মেয়াদহীন এক্সচুয়েটর ফুয়েল কক নিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করেছিল। এয়ারক্রাফটটির গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র সুইচ টেম্পারেচারটিও প্রায়ই নষ্ট থাকত। বিধ্বস্ত হওয়ার আগে এয়ারক্রাফটের ৪টি প্রধান ব্যাটারির মেয়াদ ছয় মাস আগেই উত্তীর্ণ হয়ে গিয়েছিল।

তবে ট্রু এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ বলেছে ভিন্নকথা। প্রতিষ্ঠানের সিইও উইং কমান্ডার হাসান মাসুদ বলেন, বর্তমানে তাদের এয়ারলাইন্স কোনো ফ্লাইট অপারেশন করছে না। তাদের এয়ারক্রাফটগুলোর এওসিও নেই। তারপরও হঠাৎ করে সিভিল এভিয়েশন থেকে টিম গিয়ে অভিযান চালানো রহস্যজনক। তিনি বলেন, অভিযান চালানো টিমের দুই ইন্সপেক্টর তাদের ওয়ার্কশপে গিয়ে তাদের অনুমতি ছাড়া ভিডিও ধারণ করেছে। তারা জোরপূর্বক তাদের বিমানের ছবি তুলেছে। তাদের বিদেশি ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছে। বিষয়টি তদন্ত করার জন্য তারা সিভিল এভিয়েশনের চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত চিঠি দিয়েছেন বলেও তিনি জানান।

জানা গেছে, ট্রু এভিয়েশনের পরিচালনায় একই মডেলের দুইটি পুরোনো এয়ারক্রাফট ছিল। অভিযোগ একটির পার্টস ও যন্ত্র নষ্ট হলে দ্বিতীয়টি থেকে ওই যন্ত্রটি খুলে লাগানো হতো। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, এটি মারাত্মক অপরাধ ও ঝুঁকিপূর্ণ হলেও নির্বিকার ছিল বেবিচক ও সংশ্লিষ্ট বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। এসব যন্ত্রাংশ স্থানান্তরের সময় সিভিল এভিয়েশনকে জানানোর বাধ্যবাধকতা থাকলেও মালিকপক্ষ তা করত না। উড়োজাহাজটির পাওয়ারকাট-পিসিটিও (ইঞ্জিন স্টার্ট দেয়ার যন্ত্র) প্রায়ই বিকল থাকত। ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় দেশীয় কোনো পাইলট ট্রু এভিয়েশনের ফ্লাইট চালাতেন না। বাধ্য হয়ে বিদেশি পাইলট ভাড়া করে ফ্লাইট চালানো হতো।

সূত্র: নয়াশতাব্দি


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *