
মহেশখালীতে ৫ বছরেও শেষ হয়নি সড়ক সংস্কারের কাজ

কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলায় ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে চিতাখোলা থেকে রাজঘাট ব্রিজ পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার ও পুনর্নির্মাণকাজে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশে দীর্ঘ পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি সড়কটির কাজ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিকল্প সড়ক চালু থাকার সুযোগে লোকচক্ষুর আড়ালে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে দায়সারাভাবে কাজ চালানো হয়েছে। এর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ‘ডিজাস্টার প্রকল্প’-এর আওতায় ২০২১ সালে চারটি প্যাকেজে পাঁচ কিলোমিটার সড়কের কাজ শুরু হয়। প্রতি কিলোমিটারে গড়ে ৯ কোটি টাকা হিসাবে মোট ব্যয় ধরা হয় ৪৫ কোটি টাকা। কার্যাদেশ পায় চট্টগ্রামের ‘নুর এন্টারপ্রাইজ’ এবং কক্সবাজারের ‘আসাদ এন্টারপ্রাইজ’। তবে কাজ শুরুর কিছুদিন পরই তা থমকে যায়। ২০২৩ সালের ১১ নভেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর মহেশখালী আগমন উপলক্ষে কাজের গতি কিছুটা বাড়লেও পরবর্তী সময়ে আবারও তা স্থবির হয়ে পড়ে। ২০২১ সালে শুরু হওয়া কাজ ২০২৬ সালেও শেষ করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দুটি।
মাটির সঙ্গে সিমেন্ট ও পরিত্যক্ত ইট-লোহা ব্যবহারের অভিযোগ
সরেজমিনে ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সড়ক নির্মাণে সরকারি সিডিউল অনুসরণ করা হয়নি। সিমেন্টের পরিবর্তে মাটি, পরিত্যক্ত লোহা, নিম্নমানের কংকর এবং অন্য একটি এইচবিবি রাস্তার পুরোনো ইট এনে তড়িঘড়ি করে কাজ সম্পন্ন দেখানোর অপচেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
তদারকির অভাব এবং লোকচক্ষুর আড়ালে থাকার সুযোগে এই ‘মহাদুর্নীতি’ সংঘটিত হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
কাজ ছাড়াই ৪ কোটি টাকার ‘অগ্রিম বিল’!
সরকারি আর্থিক নীতিমালায় অগ্রিম বিল দেওয়ার সুযোগ না থাকলেও আসাদ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী ও যুবলীগ নেতা আসাদ উল্লাহকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
জানা গেছে, কাজ শেষ না করেই কক্সবাজারের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন খান ও প্রকল্প পরিচালক আবু কামালের যোগসাজশে আসাদ এন্টারপ্রাইজকে চার কোটি টাকার অগ্রিম বিল দেওয়া হয়।
এ ছাড়া সংশোধিত বাজেটের নামে কাজের অলাভজনক আইটেম বাদ দিয়ে কেবল ঠিকাদারদের লাভজনক আইটেমের পরিমাণ বাড়িয়ে সুবিধা করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
তদন্ত ও সিদ্ধান্তের পরও বাস্তবায়নে অনীহা
বিগত সরকারের আমলে এলজিইডির এই উন্নয়ন প্রকল্পটি অনিয়মের আখড়ায় পরিণত হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। সূত্রের দাবি, প্রকল্পের দুর্নীতি নিয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এক সভায় জড়িত কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তবে রহস্যজনক কারণে সেই সিদ্ধান্ত আজও কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে মহেশখালী উপজেলা প্রকৌশলী বনি আমীন জনি গণমাধ্যমকে জানান, কাজটি তদারকির জন্য সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার আল আমিন ও রাহাত নামে দুজন কর্মকর্তা নিয়োজিত রয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।
একটি সূত্রের দাবি, কাজ শুরুর পর থেকে জেলা পর্যায় থেকে কোনো দল প্রকল্পটি তদারকির জন্য সরেজমিনে পরিদর্শনে যায়নি। বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবুল হাসানাত মহিউদ্দিন বিদেশ সফরে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
গোপন সূত্রে জানা গেছে, গত জুন মাসে কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবুল হাসানাত মহিউদ্দিন সরকারি সফরে যান। একজন সরকারি কর্মকর্তা বছরে একবার বিদেশ ভ্রমণের কথা থাকলেও বিভিন্ন প্রকল্পের কথা উল্লেখ করে তিনি বিদেশ ভ্রমণে বিলাসিতায় মেতে রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
আরও জানা গেছে, শুধু মহেশখালী নয়, কক্সবাজারের রামু, উখিয়া, ঈদগাঁও ও টেকনাফ উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এলজিইডির অধীনে চলমান প্রকল্পগুলোতে ঠিকাদার আসাদ এন্টারপ্রাইজের হাতে থাকা কাজগুলো অসম্পূর্ণ রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বেহাল সড়কে দুর্ভোগ, দ্রুত কাজ শেষ করার দাবি
দীর্ঘদিন ধরে সড়কটি বেহাল অবস্থায় পড়ে থাকায় চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন স্থানীয়রা। এলাকাবাসীর দাবি, অবিলম্বে অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং দ্রুত মানসম্মতভাবে সড়কটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে হবে।
কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল হাসানাত মহিউদ্দিনের সরকারি ওয়েবসাইটে দেওয়া নম্বরে ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এদিকে, কক্সবাজারের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন খানের কাছে চার কোটি টাকা অগ্রিম বিল দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি কোনো উত্তর দেননি।
এ বিষয়ে জানতে কক্সবাজার এলজিইডির সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী মো. মাহফুজুর রহমানকে ফোন করা হলেও তিনিও ফোন ধরেননি।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
