
কক্সবাজার পৌরসভার পরিষ্কার কাজের নামে ক্যাম্প থেকে শহরে রোহিঙ্গা শ্রমিক, নেপথ্যে সরোয়ার

উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে কৌশলে কক্সবাজার মূল শহরে এনে পৌরসভার পরিচ্ছন্নতার কাজে ব্যবহারের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। কক্সবাজার শহরের কোর্ট বিল্ডিং এলাকায় সম্প্রতি ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী প্রায় ৫০-৬০ জন রোহিঙ্গা যুবকের আনাগোনা দেখতে পান স্থানীয় বাসিন্দারা। খবর নিয়ে জানা যায়, 'সরোয়ার' নামের এক ঠিকাদার সস্তা শ্রমের সুযোগ নিয়ে ড্রেন ও নালা-নর্দমা পরিষ্কারের অজুহাতে তাদেরকে ক্যাম্প থেকে শহরে নিয়ে এসেছেন।
ক্যাম্পের কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টনী এবং এপিবিএনসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক চেকপোস্ট এড়িয়ে একসঙ্গে এত রোহিঙ্গা কীভাবে শহরে প্রবেশ করছে, তা নিয়ে নাগরিক সমাজে চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।

পৌর এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, নালা পরিষ্কারের উদ্দেশ্যে আনা হলেও কাজ শেষে এরা শহরের বিভিন্ন অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়ে। এদের একটি বড় অংশ পরবর্তীতে ছিনতাই, পাহাড় কাটা, খুন, মাদক সেবন ও কেনাবেচাসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে, যা পর্যটন শহরের সার্বিক নিরাপত্তাকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলছে।
অসাধু ঠিকাদাররা অতিরিক্ত মুনাফার লোভে সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নিয়মিত ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গাদের নিয়ে আসছে। ফলে একদিকে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে স্থানীয় খেটে খাওয়া শ্রমিকরা কাজ হারিয়ে কর্মহীন হয়ে পড়ছেন।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত ঠিকাদার সরোয়ারের (মোবাইল: ০১৮৯০০৭৮৬৬৪) সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টিকে এড়িয়ে গিয়ে বলেন, "পৌরসভার পরিচ্ছন্নতার কাজের জন্য লোকবলের প্রয়োজন হওয়ায় সাময়িকভাবে এদের কাজে লাগানো হয়েছিল। তবে তারা নিয়মতান্ত্রিকভাবেই কাজ করছে।"
পৌরসভা পরিচ্ছন্নতার জন্য ঠিকাদার নিয়োগ করলেও ঠিকাদাররা কাদের দিয়ে কাজ করাচ্ছে—এ বিষয়ে পৌর কর্তৃপক্ষের কার্যকর কোনো তদারকি বা নজরদারি দেখা যাচ্ছে না। পৌরসভার এমন নীরবতাকে বড় ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা বলে মনে করছেন সাধারণ মানুষ।
ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গাদের এনে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে ব্যবহার করার বিষয়ে কক্সবাজার পৌরসভার প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা ছৈয়দুল হক আজাদ জানান, "পরিচ্ছন্নকর্মী ও শ্রমিক নিয়োগের এই সংক্রান্ত দায়িত্বসমূহ মূলত কবির সাহেবের ওপর ন্যস্ত। তবুও বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর, তাই আমরা দ্রুত যাচাই-বাছাই করে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেব।"
ক্যাম্পের সীমানা এবং শহরের প্রবেশমুখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক চৌকি ও নিয়মিত তল্লাশি থাকা সত্ত্বেও কীভাবে প্রতিনিয়ত এই অবৈধ যাতায়াত ঘটছে, তা নিয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
এ ব্যাপারে কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ নাদিম আলী বলেন, "ক্যাম্পের বাইরে রোহিঙ্গাদের অনিয়ন্ত্রিত চলাচলের কোনো সুযোগ নেই। কাজের অজুহাতে কেউ যদি অবৈধভাবে রোহিঙ্গাদের শহরের এনে অপরাধের ঝুঁকি বাড়ায় বা সস্তা শ্রমের সিন্ডিকেট গড়ে তোলে, তবে তদন্ত সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও জালিয়াতি চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
কক্সবাজার শহরের সচেতন মহলের দাবি, শহর পরিচ্ছন্ন করা জরুরি হলেও তার অজুহাতে সামাজিক ও জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কক্সবাজারের পরিবেশ, শান্তি-শৃঙ্খলা ও পর্যটন আবহ বজায় রাখতে অনতিবিলম্বে ক্যাম্পের বাইরে রোহিঙ্গাদের এই অবৈধ ব্যবহার বন্ধ করা এবং অসাধু ঠিকাদার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে জেলা প্রশাসন ও পৌরসভার সরাসরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
