
চার মাসের মধ্যে ইসিএ ঘোষণা ও সীমানা নির্ধারণের নির্দেশ
বাঁকখালী নদী রক্ষায় হাইকোর্টের যুগান্তকারী রায়

কক্সবাজার শহরের প্রাণ হিসেবে পরিচিত ঐতিহ্যবাহী বাঁকখালী নদীকে অবৈধ দখল ও দূষণের হাত থেকে রক্ষা করতে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। নদীটিকে 'প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা' (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণার পাশাপাশি এর সীমানায় থাকা সমস্ত অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ এবং পরিবেশ ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) দায়ের করা এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি কাজী জিনাত হক ও বিচারপতি আইনুন নাহার সিদ্দিকার হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। গত ৮ সেপ্টেম্বর রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হয়।
সীমানা নির্ধারণের বিস্তারিত প্রক্রিয়া:

হাইকোর্টের রায়ে বাঁকখালী নদীর ভৌগোলিক ও আইনি অস্তিত্ব নিশ্চিত করতে একটি বৈজ্ঞানিক ও নির্ভুল প্রক্রিয়ায় সীমানা নির্ধারণের স্পষ্ট রূপরেখা দেওয়া হয়েছে:আরএস ও বিএস ম্যাপের সমন্বয় নদী ও এর আশেপাশের ভূমির সঠিক স্বত্ব ও আয়তন বের করতে আরএস (Revisional Survey) এবং বিএস (BS Survey) ম্যাপ পর্যালোচনা করে যৌথ সীমানা নির্ধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে নদীকে জমি হিসেবে ভুল রেকর্ড করা বা ভূমির শ্রেণি পরিবর্তনের মাধ্যমে করা বেআইনি দাবি প্রতিহত করা সম্ভব হবে।
নদীর বর্তমান প্রবাহ বিবেচনা:শুধু কাগজের রেকর্ডের ওপর নির্ভর না করে, নদীর স্বাভাবিক গতির প্রবাহ এবং বর্ষা ও জোয়ারের সময় জলের সর্বোচ্চ সীমারেখা সরেজমিনে পর্যালোচনা করার নির্দেশ নির্দেশনায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
স্থায়ী পিলার স্থাপন:সীমানা চিহ্নিত করার কাজ শেষ হওয়ার পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে নদীর পুরো সীমানাজুড়ে দৃশ্যমান ও স্থায়ী কনক্রিটের সীমানা পিলার (Boundary Pillars) বসাতে বলা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে নতুন কোনো দখলদার নদীর সীমানায় প্রবেশ করতে না পারে।
রায়ের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দিক:
ইসিএ গেজেট প্রকাশ:১৯৯৫ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী, আগামী ৪ মাসের মধ্যে বাকখালী নদী ও এর আশপাশের এলাকাকে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ (ECA) হিসেবে সরকারি গেজেট আকারে প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
উচ্ছেদ ও বনায়ন:আগামী ৪ মাসের মধ্যে সকল অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে নদীকে সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নদীর দুই তীরে উজাড় হওয়া উপকূলীয় বন পুনরায় উদ্ধার ও ম্যানগ্রোভ বনায়নের নির্দেশনা রয়েছে।
চলমান তদারকি (Continuous Mandamus) রায়টিকে ‘কন্টিনিউয়াস ম্যানডামাস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফলে নদী রক্ষায় নেওয়া পদক্ষেপ ও অগ্রগতির প্রতিবেদন প্রতি বছর জানুয়ারি ও জুলাই মাসে (ছয় মাস পরপর) নিয়মিতভাবে হাইকোর্টে জমা দিতে হবে।
নদীর আইনি সত্তাকলম্বিয়ার আত্রাতো ও পেরুর মারানিওন নদীর বৈশ্বিক উদাহরণ টেনে আদালত উল্লেখ করেন—নদী কেবল একটি সাধারণ জলধারা নয়; একটি জীবন্ত সত্তা হিসেবে এর নিজস্ব আইনি অধিকার রয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে ‘বেলা’ কর্তৃক দায়েরকৃত এই রিটটি ব্যর্থ করতে দখলকারীরা ২০২৩ সালে একটি পাল্টা মামলা দায়ের করলেও গত ২৪ আগস্ট আদালত তা খারিজ করে দেন। এই পূর্ণাঙ্গ রায়ের মাধ্যমে বাঁকখালী নদীর জৌলুস ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার পথ সুগম হলো বলে মনে করছেন পরিবেশবাদীরা।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
