
গভীর সমুদ্রবন্দর ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি, মাঠে বিভাগীয় কমিশনার-ডিআইজি
রোববার মাতারবাড়ি সফরে আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

এম.এ.কে.রানা, মহেশখালী
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ি সফরে আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
আগামীকাল রোববার (৯ আগস্ট) চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে তাঁর এক দিনের সরকারি সফরের অংশ হিসেবে মাতারবাড়ির মেগা উন্নয়ন প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনের কথা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর, কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা। জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং প্রকল্পসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে বাড়ানো হয়েছে সমন্বয়।
শনিবার প্রধানমন্ত্রীর সফরের সার্বিক প্রস্তুতি সরেজমিনে পরিদর্শন করেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন এবং চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী, পিপিএম। তাঁরা নির্ধারিত ভেন্যু, আশপাশের এলাকা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও বিভিন্ন সংস্থার প্রস্তুতি পর্যালোচনা করেন। এ সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে মাতারবাড়ির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ভেন্যু ব্যবস্থাপনা, প্রবেশ ও চলাচল নিয়ন্ত্রণ, সড়ক যোগাযোগ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে।
প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচি যাতে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়, সে জন্য সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে বলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে মাতারবাড়ির বিভিন্ন সড়ক, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও প্রকল্প এলাকার আশপাশেও বাড়তি তৎপরতা দেখা গেছে।
মাতারবাড়ি এখন বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রকল্প এলাকা। একদিকে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, অন্যদিকে দেশের গভীর সমুদ্রবন্দর দুটি বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পই এ এলাকাকে জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে দেশের আমদানি-রপ্তানি ও সামুদ্রিক বাণিজ্যে নতুন সক্ষমতা তৈরির প্রত্যাশা রয়েছে।
মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পে ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর কাজ এগিয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বন্দরের জন্য ১৪ দশমিক ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ, ৩৫০ মিটার প্রশস্ত ও ১৬ মিটার গভীর অ্যাপ্রোচ চ্যানেল নির্মাণ করা হয়েছে। এর উত্তর পাশে ২ হাজার ১৫০ মিটার এবং দক্ষিণ পাশে ৬৭০ মিটার দীর্ঘ ব্রেকওয়াটার নির্মাণও সম্পন্ন হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী ৪৬০ মিটার দীর্ঘ কনটেইনার জেটি এবং ৩০০ মিটার দীর্ঘ মাল্টিপারপাস জেটিসহ কনটেইনার ইয়ার্ড ও অন্যান্য বন্দর সুবিধা নির্মাণের কাজ রয়েছে। জাতীয় মহাসড়কের সঙ্গে বন্দরের যোগাযোগ স্থাপনের জন্য সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নের কাজও প্রকল্পের অংশ। চলতি বছরের ৩ মে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরের জেটি ও টার্মিনাল নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। এ পর্যায়ে বড় পরিসরে ড্রেজিং ও ভূমি উন্নয়নসহ বিভিন্ন কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
মাতারবাড়ি বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ১৭ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা। সরকারি পুরোনো তথ্যে এ ব্যয়ের উল্লেখ রয়েছে। তবে ২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে পুরো মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ২৪ হাজার ৩৮১ কোটি টাকা বলে জানানো হয়েছে। প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায় ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো বিবেচনায় ব্যয়ের এই পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে গভীর পানির সুবিধা। সরকারি তথ্যে বলা হয়েছে, বন্দরটি ১৬ মিটার বা তার বেশি গভীরতার বাণিজ্যিক জাহাজ পরিচালনার সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে তৈরি করা হচ্ছে। এর ফলে বড় জাহাজ সরাসরি বন্দরে ভেড়ানোর সুযোগ তৈরি হলে পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
বন্দর চালু হলে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন গতি আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ট্রান্সশিপমেন্ট নির্ভরতা কমানো এবং সামুদ্রিক পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
সরকারি তথ্যে আরও বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে বন্দরটির কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা আনুমানিক ৬ লাখ থেকে ১১ লাখ টিইইউস এবং ২০৪১ সালে তা ২২ লাখ থেকে ২৬ লাখ টিইইউসে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
মাতারবাড়ির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হলো ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। দুটি ইউনিটে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন সক্ষমতা ১২০০ মেগাওয়াট। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে কেন্দ্রটির পূর্ণ ১২০০ মেগাওয়াট উৎপাদনের প্রস্তুতির কথা জানানো হয়েছিল।
বিদ্যুৎকেন্দ্রটির সঙ্গে মাতারবাড়ি বন্দরের একটি সরাসরি অবকাঠামোগত সম্পর্ক রয়েছে। সমুদ্রপথে কয়লা ও অন্যান্য জ্বালানি পরিবহন, জেটি সুবিধা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে মাতারবাড়িতে একটি সমন্বিত বন্দর-জ্বালানি অবকাঠামো গড়ে উঠেছে।
বন্দর ও বিদ্যুৎকেন্দ্রকে কেন্দ্র করে মাতারবাড়ি এবং বৃহত্তর মহেশখালী এলাকায় ভবিষ্যতে শিল্পায়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে। উন্নত সড়ক যোগাযোগ, বন্দর সুবিধা, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের সুযোগ বিনিয়োগ আকর্ষণে ভূমিকা রাখতে পারে। এ কারণে মাতারবাড়িকে শুধু একটি বন্দর বা বিদ্যুৎ প্রকল্পের এলাকা হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে শিল্প, বাণিজ্য ও লজিস্টিক কর্মকাণ্ডের সম্ভাবনাময় কেন্দ্র হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মাতারবাড়িতে বিপুল অর্থের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশার সঙ্গে প্রকল্পের সুফলের সমন্বয় নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
স্থানীয়দের প্রধান প্রত্যাশার মধ্যে রয়েছে বড় প্রকল্পগুলোতে স্থানীয়দের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো, স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সম্পৃক্ত করা এবং প্রকল্পকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
এর পাশাপাশি যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ, পানি নিষ্কাশন, নিরাপদ পানি এবং অন্যান্য নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার দাবিও রয়েছে।
মাতারবাড়ি একটি উপকূলীয় এলাকা হওয়ায় বড় অবকাঠামো প্রকল্পের পাশাপাশি পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সমুদ্র, নদী-খাল, কৃষিজমি, মৎস্যসম্পদ ও স্থানীয় জনজীবনের ওপর প্রকল্পগুলোর প্রভাব নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি রয়েছে স্থানীয়দের।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখা না গেলে বড় অবকাঠামোর সুফল টেকসই করা কঠিন হতে পারে।
গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে শুধু জেটি ও টার্মিনাল নির্মাণই নয়, জাতীয় মহাসড়কের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি তথ্যে মাতারবাড়ি বন্দরের সঙ্গে জাতীয় মহাসড়কের যোগাযোগ স্থাপনে ২৭ দশমিক ৭ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।
বন্দর চালুর পর পণ্য দ্রুত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবহনের জন্য এই সড়ক যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা। বন্দর ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্যক্রম বিস্তৃত হলে পরিবহন, গুদামজাতকরণ, পণ্য খালাস, সরবরাহ, নির্মাণ, আবাসন ও বিভিন্ন সেবা খাতে স্থানীয়ভাবে নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি হতে পারে। তবে স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এসব কর্মকাণ্ডে স্থানীয় জনগণকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মাতারবাড়ি সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন গভীর সমুদ্রবন্দরের মূল জেটি ও টার্মিনাল নির্মাণকাজ নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। একই সঙ্গে ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রও এ অঞ্চলের জাতীয় জ্বালানি অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
ফলে প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে শুধু নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক প্রস্তুতিই নয়, মাতারবাড়ির মেগা প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়েও আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বন্দর ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের উন্নয়নের পাশাপাশি স্থানীয় কর্মসংস্থান, যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং নাগরিক সুবিধার বিষয়ে সরকারের সুস্পষ্ট উদ্যোগ থাকবে।
সব মিলিয়ে মাতারবাড়িতে প্রধানমন্ত্রীর এ সফরকে কক্সবাজারের পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়নের প্রেক্ষাপটে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সফরে মেগা প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও স্থানীয় উন্নয়ন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে কী বার্তা আসে, এখন সেদিকেই নজর স্থানীয় বাসিন্দা, প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট মহলের।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
