
মিয়ানমারে আশঙ্কাজনক হারে পাচার হচ্ছে ভর্তূকিপ্রাপ্ত সার, জ্বালানীসহ নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী, কর্তৃপক্ষ নির্বিকার!

বিশেষ প্রতিবেদক:
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান অভ্যন্তরীণ সংঘাত, বাণিজ্য কার্যক্রমে স্থবিরতার মুখে পতিত হয়ে বৈধ আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় সেখানে কৃষি উপকরণ, জ্বালানি পণ্য, নির্মাণসামগ্রী ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে বাংলাদেশ থেকে সার, জ্বালানি, ওষুধ, সিমেন্ট, টাইলস ও অনান্য নির্মাণ সামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্যের চোরাচালান উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। সীমান্ত এলাকায় সক্রিয় সংঘবদ্ধ কয়েকটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে এসব পণ্য পাচার করে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরকার কৃষক ও সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রাখার জন্য সার ও জ্বালানীর উপর সু-নির্দিষ্ট ভর্তুকি প্রদান করেন। সেই ভর্তূকিপ্রাপ্ত সার, জ্বালানী ( ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন) অবাধে পাচার হচ্ছে পার্শ্ববর্তী মিয়ানমারে। ফলে বাংলাদেশ সরকার হারাচ্ছে কোটি টাকাব ভর্তুকি প্রদত্ত অর্থ। এদিকে উখিয়া টেকনাফ, নাইক্ষ্যংছড়ি ও রামু সীমান্তের কৃষকগণ প্রয়োজনীয় সার, জ্বালানী সংকটে পতিত হচ্ছে নিরন্তর। এসব ভর্তুকিপ্রাপ্ত সামগ্রী মিয়ানমারে পাচার হবার কারণে স্থানীয়ভাবে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে সাধারণ ও প্রান্তিক কৃষক বেশি দামে সার ও জ্বালানী কিনতে বাধ্য হচ্ছে। অনেকক্ষেত্রে কৃষকগণের এসব পণ্যসামগ্রী ক্রয় ক্ষমতার বাইরে থাকায় অথবা প্রয়োজনীয় সার ও জ্বালানী সংকটের কারনে মাঠের খাদ্যশস্য, তরিতরকারি বিভিন্ন অর্থকরী ফসলের উৎপাদনে সার ও জ্বালানী সংকটে কৃষককুলকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ফলে সরকারের ভর্তূকি প্রাপ্ত আইটেমগুলো সাধারণ কৃষক ও মানুষের কোন কাজে না আসায় কোটি কোটি টাকার ভর্তুকি প্রদত্ত অর্থ অপচয় হচ্ছে। অন্যদিকে কৃষককূল তাদের অর্থকরী ফসলের নিরবিচ্ছিন্ন উৎপাদন করতে না পারায় খাদ্যোৎপাদন যেমন বিঘ্ন ঘটছে, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথও মারাত্মকভাবে রুদ্ধ হচ্ছে। সাথে দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পথও বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মিয়ানমারে বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরকান আর্মির সঙ্গে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিপি ও সেনাবাহিনীর চলছে তুমুল লড়াই। যার রেশ পড়েছে বান্দরবানের ঘুমধুম, তুমব্রু এবং কক্সবাজারের উখিয়ার আঞ্জুমান পাড়া, রহমতেরবিল, বালুখালী, কুতুপালং, হাজামরোড, ভালুকিয়া, পাতাবাড়ি, পাগলীরবিল ও টেকনাফের হ্নীলা, হোয়াইক্যং, টেকনাফ সদর, সাবরাং, শাহপরীর দ্বীপ সীমান্তে। যদিও বা বিজিবি দাবি করছে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে তারা, অন্যদিকে প্রায় ২৭১ কিমিটার সীমান্তে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিবি) কঠোর নজরদারি রয়েছে; তারপরও কোনভাবেই মিয়ানমারে, সার, তেল ও খাদ্যপণ্য পাচার ঠেকানো যাচ্ছে না। তবে কীভাবে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে মিয়ানমারে এতো সার, তেল ও খাদ্যপণ্য পাচার হচ্ছে তা নিয়ে জনমনে নানা শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় ওয়াকেফমহল, গণমাধ্যমকর্মী ও সুশীল সমাজের মতে, 'শষ্যের ভিতর ভুত' থেকে যাবার কারণেই মাঝে মাঝে সীমান্ত উন্মুক্ত হয়ে পড়ে-ফলে দুষ্কৃতকারীরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে উভয়কুল সামলে পাচার অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
সীমান্তের স্থল পয়েন্টের পাশাপাশি মিয়ানমারে সার ও তেল পাচারের নিরাপদ রুট হিসেবে সমুদ্র উপকূলকে ব্যবহার করছে চোরাকারবারিরা।
কক্সবাজার সমুদ্র উপকূলে রয়েছে অসংখ্য পয়েন্ট। তার মধ্যে পাচারের নিরাপদ স্থান হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে উখিয়ার রেজুখাল, ইনানি, হিমছড়ি ও নাজিরারটেক পয়েন্ট। আর টেকনাফে ব্যবহার হচ্ছে শাহপরীর দ্বীপ,
শামলাপুর ও বাহারছড় পয়েন্ট।
সূত্রে আরো জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দর এলাকা, কক্সবাজারের টেকনাফ, শাহপরীর দ্বীপ, সেন্টমার্টিন সংলগ্ন সমুদ্রপথ এবং নাফ নদীকে ব্যবহার করা হচ্ছে চোরাচালানের প্রধান রুট হিসেবে। বিশেষ করে মিয়ানমারের মংডু এলাকায় এসব পণ্যের ব্যাপক চাহিদা থাকায় পাচারকারীরা সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
মিয়ানমারে বর্তমানে এক বস্তা সিমেন্টের দাম বাংলাদেশি বাজারের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। গত সপ্তাহে রাখাইনে এক বস্তা সিমেন্ট ৩২ হাজার থেকে ৪২ হাজার কিয়াত পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। যেখানে বাংলাদেশে একই পরিমাণ সিমেন্ট তুলনামূলক অনেক কম দামে পাওয়া যায়। এই বড় ধরনের মূল্য ব্যবধান পাচারকারীদের জন্য বড় মুনাফার সুযোগ তৈরি করেছে।
একইভাবে মিয়ানমারে সারের দামও অস্বাভাবিক বেড়েছে। দেশটিতে ৫০ কেজির এক বস্তা ইউরিয়া সার বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১ লাখ ৫৭ হাজার কিয়াত এবং ডিএপি সার প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার কিয়াত পর্যন্ত। ফলে বাংলাদেশের বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদিত সারও পাচারের ঝুঁকিতে পড়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের সিইউএফএল, কাফকো ও ডিএপি সার কারখানার উৎপাদিত সারের একটি অংশ সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমারে চলে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি, সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়া এবং বৈধ আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় নির্মাণসামগ্রী, কৃষি উপকরণ ও জ্বালানি পণ্যের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। এর সুযোগ নিচ্ছে বাংলাদেশ ভিত্তিক কিছু পাচারকারী চক্র। বাংলাদেশে তুলনামূলক কম দামে পাওয়া এসব পণ্য সীমান্ত পেরিয়ে মিয়ানমারে কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে।
সম্প্রতি কোস্টগার্ডের এক অভিযানে তিনটি কার্গো নৌকা থেকে ২ হাজার ৪০০ বস্তা সিমেন্ট এবং ২৫০ বস্তা ডিএপি সার জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় ২২ জনকে আটক করা হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত ওই অভিযানে জানা যায়, জব্দ করা এসব পণ্য মিয়ানমারের মংডু এলাকায় পাচারের প্রস্তুতি চলছিল। তদন্তে আরও উঠে আসে, সারের বস্তায় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) লোগো ব্যবহার করে পণ্যের পরিচয় আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
এর আগে বঙ্গোপসাগর হয়ে রাখাইনে সার পাচারের সময় কোস্টগার্ডের অভিযানে ১১ জনকে আটক করা হয়। এছাড়া নৌবাহিনীর অভিযানে কুতুবদিয়া উপকূল থেকে ৬৫০ বস্তা সিমেন্ট, এক হাজার লিটার ডিজেল এবং একটি নৌযান জব্দ করা হয়েছিল। আটক ব্যক্তিরা জিজ্ঞাসাবাদে অধিক লাভের আশায় এসব পণ্য মিয়ানমারে নিয়ে যাচ্ছিলেন বলে জানিয়েছিলেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশে সরকার কৃষকদের জন্য ভর্তুকি দিয়ে সার সরবরাহ করায় দেশের বাজারে এসব পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রিত থাকে। কিন্তু মিয়ানমারে যুদ্ধ, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং আমদানি ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে এসব পণ্যের দাম কয়েক গুণ বেড়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পাচারকারীরা সীমান্তে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে।
এ বিষয়ে কক্সবাজার র্যাব-১৫ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট. কর্নেল এইচ এম সাজ্জাদ হোসেন বলেন, পাচারে জড়িতদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে এখনি আমরা নামগুলো জানাচ্ছি না। একই সঙ্গে সমুদ্র উপকূলের পয়েন্টগুলো চিহ্নিত করার পাশাপাশি চোরাকারবারিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানান তিনি।
গত দেড়মাসে মিয়ানমারে পাচারকালে ১০ হাজার লিটার জ্বালানি তেল, ৩ হাজার লিটার সয়াবিন তেল, ৫০০ কেজি ময়দা, ওষুধ, পেঁয়াজ, রসুন ও আদাসহ ৩৫ পাচারকারীকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
পাচারকারীরা সাধারণত গভীর রাতে ছোট কার্গো নৌকা, স্পিডবোট ও মাছ ধরার ট্রলার ব্যবহার করে থাকে। উপকূলের নির্জন ঘাট থেকে এসব পণ্য তুলে নাফ নদী বা সমুদ্রপথে রাখাইনের বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে দেওয়া হয়। অনেক সময় বৈধ জেলেদের নৌযানও এই কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করলেও পাচারকারীরা নানা কৌশলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে যাচ্ছে। কখনও মাছ ধরার অজুহাতে, আবার কখনও নৌযানের ভেতরে বিশেষভাবে পণ্য লুকিয়ে তারা সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা করে।
পাচার বন্ধে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন উপকূলে সমন্বিত নৌ টহল বৃদ্ধি, সার ও সিমেন্টের সরবরাহ ব্যবস্থায় নজরদারি বাড়ানো, সীমান্তঘাটে গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার এবং পাচারকারী চক্রের অর্থের উৎস শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের আশঙ্কা, মিয়ানমারের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশ থেকে ভর্তুকিপ্রাপ্ত কৃষি উপকরণ, নির্মাণসামগ্রী ও জ্বালানি পাচারের প্রবণতা আরও বাড়তে পারে। মিয়ানমারে সার, জ্বালানি, নির্মাণ সামগ্রী ও ওষুধ পাচারের মাধ্যমে দেশের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রায় আমদানি করা পণ্য এবং সরকারের ভর্তুকির অর্থ অপচয় হচ্ছে। এতে দেশের অর্থনীতি ও বাজার ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তাই এসব পণ্যসামগ্রী পাচার রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহনের দাবি স্থানীয়দের।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
