
কক্সবাজার জেলায় ১৮০টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের ১৫৫ টি চলছে নবায়ন ছাড়াই

কক্সবাজারে লাইসেন্স নবায়ন ছাড়াই বহাল তবিয়তে চলছে অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। জেলার তালিকাভুক্ত ১৮০টি বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে লাইসেন্স নবায়ন করেছে মাত্র ২৫টি প্রতিষ্ঠান।

দীর্ঘদিন ধরে নবায়ন না করে চিকিৎসাসেবা চালানোর পাশাপাশি হাসপাতালগুলোর বিরুদ্ধে অনুমোদিত বেডের চেয়ে অতিরিক্ত রোগী ভর্তি, ২৪ ঘণ্টা পর্যাপ্ত ডাক্তার-নার্স না রাখা, অস্ত্রোপচারে অপ্রশিক্ষিত জনবল ব্যবহার এবং পার্কিংসহ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মৌলিক শর্ত না মানার পাহাড়সম অভিযোগ উঠেছে। সরকারি হাসপাতালের ওপর অতিরিক্ত চাপের সুযোগে বেসরকারি খাতে এমন অনিয়ম চললেও কার্যকর তদারকি ও তড়িঘড়ি অভিযান নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলেছেন রোগী ও স্বজনরা।
কক্সবাজার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় তালিকাভুক্ত বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ডেন্টাল ও মেডিকেল চেকআপ সেন্টার রয়েছে মোট ১৮০টি। এর মধ্যে হাসপাতাল ও ক্লিনিক ৪৫টি, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ১১৭টি, ডেন্টাল ক্লিনিক ১০টি, ফিজিওথেরাপি সেন্টার ১টি এবং মেডিকেল চেকআপ সেন্টার রয়েছে ৭টি। তবে চমকপ্রদ তথ্য হচ্ছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাত্র ২৫টি প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স নবায়ন করেছে। বাকি ১৫৫টি প্রতিষ্ঠানই পরিচালিত হচ্ছে পূর্বের বা মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্স দিয়ে।
১০ উপজেলা নিয়ে গঠিত কক্সবাজার জেলায় জনশুমারি অনুযায়ী জনসংখ্যা প্রায় ২৮ লাখ ২৩ হাজার ২৬৬ জন। এর সাথে যুক্ত হয়েছে মিয়ানমার থেকে আসা বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার অতিরিক্ত চাপ। জেলার একমাত্র ২৫০ শয্যার সরকারি হাসপাতালটির ওপর চাপ থাকায় সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকের ওপর নির্ভরশীল হচ্ছেন।
জেলা শহরের 'হাসপাতাল সড়ক' এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী ২৪ ঘণ্টা ডিগ্রিধারী চিকিৎসক ও নার্স থাকার কথা থাকলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে তা নেই। ওটি (অপারেশন থিয়েটার) বয় ও আয়া দিয়ে চালানো হচ্ছে অস্ত্রোপচারের জরুরি কাজ। চিকিৎসকদেরও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ডেকে আনা হয় অস্ত্রোপচারের ঠিক মুহূর্তটিতে। উপরন্তু, প্রান্তিক এলাকা থেকে আসা রোগীদের টার্গেট করে সক্রিয় রয়েছে এক শ্রেণির দালাল চক্র।
সম্প্রতি হ্নীলার বাসিন্দা আনোয়ারুল ইসলাম তাঁর স্ত্রী শরিফা আক্তারকে প্রসব বেদনায় চেইন্দা হোপ হাসপাতালে ভর্তি করালে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ ওঠে। ভুল চিকিৎসায় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে পরবর্তীতে ইউনিয়ন হাসপাতালে নিয়ে তাঁর জরায়ু কেটে অস্ত্রোপচার করতে হয়।
অন্যদিকে শহরের হাসপাতালগুলোর অন্যতম বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে পার্কিং। অধিকাংশ ভবনের সামনে অ্যাম্বুলেন্স বা রোগী বহনকারী গাড়ি রাখার সুযোগ নেই। নকশায় পার্কিং প্রদর্শন করে অনুমোদন নেওয়া হলেও পরবর্তীতে পার্কিংয়ের জায়গাগুলোতে ফার্মেসি, চেম্বার কিংবা দোকানঘর বানিয়ে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। ফলে হাসপাতাল সড়কজুড়ে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট। টেকনাফ থেকে আসা রোগী স্বজন শাহেদ করিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "রোগী নিয়ে এসে গাড়ি পার্ক করার জায়গা পাইনি, বাধ্য হয়ে স্টেডিয়ামের সামনে গাড়ি রেখে রোগীকে হাসপাতালে নিতে হয়েছে।"
একই দৃশ্য দেখা গেছে— ইউনিয়ন হাসপাতাল, একেএস, সেন্ট্রাল হাসপাতাল, জেনারেল হসপিটাল, সি-সাইড, সেবা ডায়াগনস্টিক সেন্টার, সিআইসি, ডিজিটাল, ন্যাশনাল, মা ও শিশু এবং প্রিমিয়ার মেডিকেল সেবাসহ শহরের একাধিক নামীদামী স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে।
আইনলঙ্ঘন ও অনিয়মের বিষয়ে কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ছাবের জানান, "জেলার সব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের তালিকা হালনাগাদ করা হয়েছে। যাদের লাইসেন্স নবায়ন নেই, তাদের দ্রুত প্রক্রিয়া শেষ করতে বলা হয়েছে। অন্যথায় অবৈধ ও নিয়মভাঙা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিয়ে সিলগালা করে দেওয়া হবে।"
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. জসিম উদ্দিন বলেন, "অভিযানে নেমে ফুয়াদ আল খতীব ও সি-সাইড হাসপাতালে পার্কিংসহ নানা অনিয়ম পাওয়া গেছে। বাকি ভবনগুলোও তদন্ত করে বিধিমতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান স্পষ্ট জানিয়েছেন, লাইসেন্স নবায়ন ছাড়া অবৈধভাবে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা ও বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
