
এনজিও ও আইএনজিও‘রদখলে হাজারো একর সরকারি বনভূমি
চলছে বনবিভাগ আর সিন্ডিকেটের খেলা

* মোটা অংকের লেনদেনর মাধ্যমে বন কর্মকর্তারাই জমি দখল দিয়েছে-অভিযোগ সচেতন মহলের
* মাসে কোটি টাকা যাচ্ছে দখল সিন্ডিকেটের পকেটে
* বন সংকুচিত, হুমকির মুখে বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র

* লোক দেখানো সরকারি নোটিশে পাত্তা নেই
* এনজিও-আইএনজিওদের দাপট বেড়েই চলেছে
কক্সবাজার ৭১ রিপোর্ট:
কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের বনাঞ্চল শুধু আশ্রিত রোহিঙ্গাদের চাপেই সংকুচিত হয়নি; সুযোগ বুঝে দেশি-বিদেশি এনজিও ও আইএনজিও সংস্থাগুলোও দখল করে নিয়েছে হাজারো একর সরকারি বনভূমি। সরকারি নোটিশ ও আইনের তোয়াক্কা না করে এই প্রতিষ্ঠানগুলো অফিস, ওয়্যারহাউস ও স্থাপনা গড়ে তুলেছে। অথচ এই জমি যদি সরকার ইজারা দিত, বছরে শতকোটি টাকা রাজস্ব আদায় হতো। বাস্তবে এখন কোটি কোটি টাকা চলে যাচ্ছে দখলবাজ সিন্ডিকেটের হাতে।
এলাকাবাসী অভিযোগ করেন, মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে বনকর্মকর্তরা এনজিও-আইএনজিওদের বনের জায়গা দখলে দিয়ে লোক দেখানো নোটিশ করে। কিন্তু ঐ নোটিশের কোন ধরনের কার্যকারিতা নেই। এনজিওদের সাথে এটি নোটিশ নোটিশ খেলা ছাড়া কিছুই নয় বলে জানান সচেতন মহল।
উল্লেখ্য যে, উখিয়া রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা, আব্দুল মন্নানের বিরুদ্ধে ইতিপুর্বে বন বিভাগের জায়গা বিক্রি করে ভুমিদস্যুদের বনের জায়গায় বাড়ী করার সুযোগ করে দিয়ে এমন অভিযোগে জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। তার কারনেই বনের জায়গায় বিভিন্ন এলাকায় বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে এবং বর্তমানে নির্মানাধীন এখনো অনেক ভবন রয়েছে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে তৎকালীন ডিএফও রহস্যজনক নিরবতায় সচেতন মহলে অনেক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এলাকাবাসী নবাগত কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগীয় কর্মকর্তার নিকট উখিয়া রেহ্জ কর্মকর্তা আব্দুল মান্নানের বিরুদ্ধে ইতিপুর্বের সকল অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার দাবী জানান। এবং বন বিভাগের জায়গা পুনঃরুদ্ধারের ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানান।
সরেজমিন তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, কক্সবাজারের উখিয়ার বনভূমি দখলের নেপথ্যে এনজিও-আইএনজিও সিন্ডিকেট। ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে আশ্রয় নিতে আসা রোহিঙ্গাদের জন্য উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়ি বনভূমি খোলা হয়। কয়েক বছরের মধ্যে হাজার হাজার একর বন কেটে আশ্রয়স্থল, বাজার ও দোকানপাট গড়ে ওঠে। সেই সময়কে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন এনজিও ও আন্তর্জাতিক সংস্থা বনভূমিতে অফিস স্থাপন শুরু করে। ওয়ালাপালংয়ের মুহুরীপাড়া এলাকায় বনের বিশাল অংশ দখল করে স্থাপনা করেছে মাইশা এন্টারপ্রাইজ। কোম্পানির ম্যানেজার রাশিক খান নিজের দাপটে স্থানীয়দের প্রবেশও সীমিত করেছেন। সাংবাদিক ঢুকলে ক্যামেরা চালাতে পর্যন্ত নিষেধ করা হয়।
গত বেশ কয়েক বছর আগে বনের জমিতে বিশালাকার ওয়্যার হাউস ও অফিস করে এই কোম্পানির ম্যানেজার রাশিক খান নিজের দাপট দেখিয়ে অফিস পরিচালনা করে আসছে বলে জানা গেছে । তার এতোই দাপট স্থানীয়রাও সহজে তাদের অফিসে ডুকতে পারেনা । অফিসের সামনে সবসবময় বয়েকজন যুবক বসিয়ে রাখেন যেন বাইরের কেউ ভেতরে ঢুকতে না পারে এমনটা নজরে এসেছে । প্রতিবেদক অফিসে গেলে ক্যামরাম্যানকে বাইরে চলে যেতে বরে এবং কোন প্রকার ভিড়িও না করার জন্য বারণ করেন রাশিক নিজেই। গত বছর ২০২৪ সালের সেপ্টম্বর মাসের ২৯ তারিখ ৩০/ উসবি-০৮ মূলে বনবিভাগ উখিয়া রেঞ্জের অধিনে উখিয়া বিট তাদের নোটিশ প্রদান করে জানতে চান তারা কিভাবে এই স্থাপনা করেছেন তার সকল বৈধ কাগজপত্র নিয়ে বিট কর্মকর্তা বরাবর দাখিল করতে বলা হয়। কিন্তু আইন অমান্য করে আজও অফিস কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এমনই দৃশ্য ওয়ালাপালং, মধুরছড়া, কুতুপালং, ফলিয়াপাড়া ও বিভিন্ন এলাকায়। কোথাও গড়ে উঠেছে বিশাল ওয়্যারহাউস, কোথাও অফিস, কোথাও আবার পশুখামারের আড়ালে প্রকল্প চালাচ্ছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। তারা সরকারেরি আদেশ নির্দেশও মানছে না। সরকারের নোটিশ অমান্যের পাশপাশি তারা আহরহ আইন ভাঙার দাপট দেখিয়ে চলেছে।
২০২৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর বনবিভাগের উখিয়া রেঞ্জ অফিস থেকে ব্রাক, ডাব্লিউএফপি, আইওএম, ইউএনএইচসিআরসহ ছয়টি এনজিও-আইএনজিওকে নোটিশ প্রদান করা হয়। নোটিশে ছয় কর্মদিবসের মধ্যে বৈধ কাগজপত্র জমা দিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু আইন অমান্য করে কোনো সংস্থাই জবাব দেয়নি। বরং তারা আগের মতো দখলকৃত স্থাপনায় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
বন আইন ১৯২৭ (সংশোধিত ২০০০) অনুযায়ী সংরক্ষিত বনে স্থাপনা তৈরি করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অথচ আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে শুরু করে স্থানীয় সংগঠন পর্যন্ত কেউই আইনের তোয়াক্কা করছে না।
স্থানীয় সূত্র জানায়, এসব বনভূমি সরাসরি এনজিওরা দখল করেনি। তারা স্থানীয় প্রভাবশালীদের কাছ থেকে ভাড়া নিয়েছে। স্ট্যাম্প চুক্তির নামে মাসে কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি সিন্ডিকেট।
উদাহরণস্বরূপ, সাবেক উখিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী মধুরছড়ার একটি দখলকৃত জায়গা মাসে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকায় ভাড়া দিয়েছেন আন্তর্জাতিক সংস্থা ডাব্লিউএফপি-কে। মুহুরীপাড়ার ইব্রাহিম নামের এক দখলদার প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন -তিনি বনভূমি দখল করে এনজিও ফোরামকে ভাড়া দিয়েছেন এবং মাসে লাখ টাকা আয় করছেন।
সচেতন মহল বলছেন, এই অর্থ সরাসরি সরকারের কোষাগারে গেলে রাজস্ব আয় হতো শতকোটি টাকা। কিন্তু বাস্তবে এই টাকা চলে যাচ্ছে দখল সিন্ডিকেটের পকেটে। মাসে কোটি টাকা যাচ্ছে দখলদারদের হাতে।
বন বিভাগ সূত্র বলছে, উখিয়া সদর বিটের ওয়ালাপালং, মৌজার আর.এস দাগ নং- ৮৬৪৬, ৮৯০১, ৮৯০১, ৮৬৪০, ১৭০, ৮৬৪০, মধুরছড়া, মুহুরীপাড়া (আমগাছ তলা), কুতুপালং (বটগাছ তলা), টি এন্ড টি ও (রোহিঙ্গা ক্যাম্প-৪ এক্সটেনশন সংলগ্ন) এলাকায় সরকারি সংরক্ষিত বনভূমিতে সম্পূর্ণ বে-আইনীভাবে নির্মিত স্থাপনায় কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ডাব্লিউএফপি, আইওএম ও ইউএনসিআর সহ দেশীয় এনজিও ব্রাক, জনসেবা কেন্দ্র ও মাইশা এন্টারপ্রাইজ।
এই বিষয়ে জানতে নবাগত কক্সবাজার দক্ষিন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী তারিকুররহমান জানান, আমি নতুন দায়িত্ব নিয়েছি এই বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখবো।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
