
ফের সক্রিয় মানবপাচার সিন্ডিকেট
টার্গেট রোহিঙ্গা ও বেকার যুবকদের

- টেকনাফে যৌথ বাহিনীর হাতে উদ্ধার ৫৭ জিম্মি
- শীত মৌসুমে সাগর শান্ত হওয়ার সুযোগ
- বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানে সেনাসদস্য নিহত
বিশেষ প্রতিবেদক:
শীতকাল মানেই বঙ্গোপসাগর শান্ত থাকা এবং অনুক আবহাওয়া। আর এই প্রাকৃতিক অবস্থাকেই মানবপাচারকারী আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট তাদের অবৈধ ব্যবসার ‘গোল্ডেন সিজন’ বা উপযুক্ত সময় হিসেবে বেছে নেয়। সাগর উত্তাল না থাকায় সহজেই ট্রলার বা ফিশিং বোটে করে অবৈধ পথে মানুষ পারাপার করা সম্ভব হয়-এই লোভনীয় সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কক্সবাজারের টেকনাফ উপকূল ও পাহাড়ি অঞ্চলকে রুট বানিয়ে ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে দেশজুড়ে বিস্তৃত মানবপাচারকারী চক্র।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অবস্থান ও যৌথ বাহিনীর রক্তক্ষয়ী সাঁড়াশি অভিযান এই সিন্ডিকেটগুলোর শেকড়ে বড় ধরনের আঘাত হেনেছে।
শীতকালীন সিজন ও মানবপাচারের ভয়ংকর রুট: থাইল্যান্ড-মালয়েশিয়া চক্র
অনুসন্ধান ও ভিকটিমদের জবানবন্দি অনুযায়ী, মানবপাচার চক্রের নেটওয়ার্ক এখন শুধু টেকনাফেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা দেশের বিভিন্ন জেলা ও মফস্বল পর্যন্ত বিস্তৃত। স্থানীয় দালাল ও রিক্রুটিং এজেন্টরা উঠতি বয়সী ও সহজ-সরল যুবকদের মালয়েশিয়ায় উচ্চ বেতনের লোভনীয় চাকরি, ফ্রি ভিসা এবং উন্নত জীবনের রঙিন স্বপ্ন দেখায়। ?এরপর শুরু হয় তাদের অভিনব ও মর্মান্তিক বন্দিদশা।
টেকনাফের পাহাড়ি আস্তানা
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগৃহীত যুবকদের প্রথমে টেকনাফের দুর্গম পাহাড়ি এলাকার বিভিন্ন গোপন আস্তানায় এনে জিম্মি করে রাখা হয়। পরে সেখান থেকে নৌপথে মালেশিয়ার পথে,রওনা দেন।
থাইল্যান্ড হয়ে হাতবদল ও মুক্তিপণ আদায়: সাগরপথে টেকনাফ থেকে ট্রলারে করে তাদের প্রথমে থাইল্যান্ডের বিভিন্ন পয়েন্টে বা আস্তানায় পাচার করা হয়। সেখানে তাদের জিম্মি করে পরিবারের কাছে ভিডিও কল বা অডিও বার্তা পাঠিয়ে প্রতি জনের বিপরীতে ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ দাবি করা হয়।
অমানবিক নির্যাতন ও ‘রিসিভার’ প্রথা:
পরিবারের পক্ষে যারা নির্ধারিত সময়ে টাকা দিতে পারে, কেবল তারাই মালয়েশিয়া যাওয়ার সুযোগ পায়। আর যারা টাকা দিতে ব্যর্থ হয়, তাদের ওপর চালানো হয় পৈশাচিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। এছাড়া মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর পর সেখানে অপেক্ষমাণ ‘রিসিভার’ বা গ্রহণকারীকে ছাড়িয়ে আনার জন্য অতিরিক্ত আরও লাখ লাখ টাকা পরিশোধ করতে হয়।
মানবপাচার ও অপরাধের এমন একটি দুর্গম আস্তানায় গত ৫ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে সাঁড়াশি অভিযান চালায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, পুলিশ ও এপিবিএনের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনী।
সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের রঙ্গীখালী এলাকার গহীন পাহাড়ি আস্তানায় অভিযানকালে যৌথ বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে সশস্ত্র মানবপাচারকারী ও ডাকাত দলের সদস্যরা অতর্কিত ব্রাশফায়ার শুরু করে। জীবন বাজি রেখে যৌথ বাহিনীর সদস্যরাও পাল্টা আক্রমণ চালান।
এই তুমুল গোলাগুলির সময় সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চৌকস সৈনিক মো. তিতাস শেখ (২৭) বাম কাঁধে মারাত্মকভাবে আহত হন। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাঁকে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য রামু সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেওয়ার পথে তিনি শহীদ হন। প্রায় ৯ বছর ধরে অত্যন্ত সততা ও নিষ্ঠার সাথে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে (০১ বীর ইউনিট) কর্মরত ছিলেন শহীদ তিতাস।
রঙ্গীখালীর ওই গহীন পাহাড়ে দীর্ঘক্ষণ চলা চিরুনি অভিযানে মানবপাচার চক্রের কবল থেকে অক্ষত অবস্থায় ৫৭ জন জিম্মিকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয় যৌথ বাহিনী। উদ্ধারকৃতদের মধ্যে বাংলাদেশি বিভিন্ন জেলার সাধারণ যুবকদের পাশাপাশি কিছু রোহিঙ্গা নাগরিকও রয়েছে, যাদের জোরপূর্বক সাগরপথে মালয়েশিয়া পাচারের উদ্দেশ্যে আটকে রাখা হয়েছিল।
অভিযানে মানবপাচার চক্রের ৫ জন সক্রিয় সদস্যকে হাতেনাতে আটক করা হয়। এ সময় তাদের আস্তানা তল্লাশি করে একটি পিস্তল, একটি দেশীয় তৈরি বন্দুক (ওয়ান শুটার গান) এবং চার রাউন্ড তাজা কার্তুজ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় অপরাধ সিন্ডিকেট যেমন মো. আলম ও মো. সাদ্দাম চক্র এই দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলকে নিরাপদ জোন বানিয়ে অবৈধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিল।
টেকনাফ ও এর আশপাশের জনপদে মানবপাচার রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এর আগেও বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর অভিযান পরিচালনা করেছে।
এর আগেও টেকনাফের মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন গহীন পাহাড় ও গুহাগুলোতে যৌথ বাহিনী অভিযান চালিয়ে অসংখ্য জিম্মিকে উদ্ধার করেছে। পাহাড়ের প্রাকৃতিক আড়ালকে ভেঙে পাচারকারীদের নেটওয়ার্ক গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
মানবপাচারকারীদের টার্গেট :
সক্রিয় মানবপাচারকারীরা সহজ সরল অশিক্ষিতদের বেশী টার্গেট করে। কিন্তু ইদানিং রোহিঙ্গা নারী পুরুষ ও বেকার যুবকদের দিকেই বেশী টার্গেট করছে বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শীরা। তবে অতিদরিদ্রদের দিকে তারা তেমন নজর দেয়না বলেও জানা গেছে।
নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনা টহল:
কোস্ট গার্ড ও বিজিবির কঠোর নজরদারির কারণে নাফ নদী বা সাগরে ফিশিং ট্রলারযোগে মানবপাচারের বহু চেষ্টা মাঝপথেই ব্যর্থ করে দেওয়া হয়েছে।
জেলা পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান জানান, মানবপাচার প্রতিবোধে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। জেলার প্রতিটি উপজেলায় বলা আছে মানব পাচারকারীদের যেন চিহ্নিত করা হয় এবং আইনের আওতায় আনা হয়।
জেলা প্রশাসক মোঃ আঃ মান্নান জানান মানবপাচার বন্ধে জেলা প্রশাসন নিয়মিত কাজ করছে। এটি যেহেতু সিমান্ত এলাকা তাই সাধারণ মানুষকে মানব পাচারকারীদের কবলে যেন না পড়ে সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহবান করছি। অন্যদিকে প্রতিটি উপজেলায় ইউএনও মাধ্যমে মানব পাচারকারীদের বিরোদ্ধে কাজ চলমান রয়েছে।
দেশব্যাপী শেকড় উৎপাটন:
শুধু টেকনাফ নয়, ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা রিক্রুটিং এজেন্ট ও দালালদের গ্রেফতারে গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশের সাইবার উইংয়ের চিরুনি অভিযান বর্তমানেও চলমান রয়েছে।?শীত মৌসুমকে পুঁজি করে গড়ে ওঠা এই আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের মূলোৎপাটনে যৌথ বাহিনীর এই কড়া অবস্থান সাধারণ মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে এবং পাচারকারীদের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
