
বন ভক্ষণের ইতিকথা-১
ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জে চলছে বনজ সম্পদ লুটপাটের মহোৎসব!

## ৫ বিটে ১৩ হাজার একর বনাঞ্চল হুমকির মুখে
## ধ্বংস হচ্ছে বনাঞ্চল ও জলপ্রবাহ
## নলবিলা চেক স্টেশন: অনিয়ম ও চাঁদাবাজির কেন্দ্রস্থল!

বিশেষ প্রতিবেদক:
কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ফাঁসিয়াখালী বন রেঞ্জের সংরক্ষিত বনাঞ্চল যেন দখলদার ও বনজ সম্পদ লুটেরাদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। পাহাড় কেটে বনভূমি দখল, সংরক্ষিত বনের গাছপালা উজাড় করে পাকা বাড়িঘর, খামার ও বাগান নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। শুধু বনভূমি দখলই নয়, রেঞ্জের আওতাধীন নলবিলা চেক স্টেশনে কাঠবোঝাই যানবাহন থেকে নিয়মিত লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায়েরও গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব কর্মকাণ্ডে বন বিভাগের একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছেন ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা।
ফাঁসিয়াখালী বন রেঞ্জের অধীনে রয়েছে পাঁচটি বনবিট- ফাঁসিয়াখালী, ডুলাহাজারা, মানিকপুর, কাকারা ও নলবিলা বনবিট কাম চেক স্টেশন। মোট ১৩ হাজার ৬০১ একর বিশাল এই বনভূমি রক্ষার দায়িত্বে রয়েছেন রেঞ্জ কর্মকর্তা (প্রশিক্ষণরত সহকারী বন সংরক্ষক) মো. কামরুল হাসান।
স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, ফাঁসিয়াখালী বনবিটের উচিতার বিল মৌজার ফতেহার ঘোনা এলাকায় গত ছয় মাসে সরকারি বনভূমির পাহাড় কেটে অন্তত ২০টির বেশি পাকা বাড়িঘর নির্মাণ করা হয়েছে। একইভাবে পুরো রেঞ্জের পাঁচটি বনবিটে বর্তমানে অন্তত এক হাজার পাকা বাড়িঘর গড়ে উঠেছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রের। অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট বনবিট কর্মকর্তা ও রেঞ্জ কার্যালয়ের দায?িত্বশীলদের মাসোহারা বা উৎকোচ দিয়ে ‘ম্যানেজ’ করেই সরকারি বনভূমিতে এসব অবৈধ স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে।
সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গাছপালা কেটে বনভূমি দখলের পাশাপাশি কোথাও কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে সরকারি জমি ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হচ্ছে। আবার কোথাও ড্রেজার ও এক্সকেভেটর বসিয়ে দিন-রাত বালু ও মাটি উত্তোলন করা হচ্ছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের রংমহল, গোলাপপাড়ি, হারবাং ও কুতুবদিয়া এলাকায় সংরক্ষিত বনভূমির বিশাল অংশ দখল হয়ে গেছে।
বিশেষ করে কোচাখালী বনবিটের আওতাধীন ৬১ ও ৭০ নম্বর দাগে প্রায় ১৫ একর সরকারি বনভূমি দখল এবং বনায়নের গাছ কেটে ফেলার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া ফাঁসিয়াখালী ছড়া ও খালের আশপাশে অবৈধভাবে বালু-মাটি উত্তোলনের ফলে ছড়ার স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তিত হচ্ছে, সৃষ্টি হচ্ছে ভয়াবহ মাটি ক্ষয় ও বসতবাড়ি ভাঙন।
ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জের নলবিলা বনবিট কাম চেক স্টেশনকে ঘিরে সবচেয়ে মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। বন বিভাগের একটি সূত্রের দাবি, পার্বত্য জেলাসমূহসহ টেকনাফ, উখিয়া, রামু ও নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকা থেকে প্রতিদিন শত শত কাঠবোঝাই গাড়ি এই চেক স্টেশন অতিক্রম করে। বিট কর্মকর্তা আবদুল ওয়াহাবের নেতৃত্বে দায?িত্ব পালনকারী কর্মচারীদের একটি চক্র এসব গাড়ি থেকে নিয়মিত লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করছে। এই অবৈধ আয়ের টাকা বন বিভাগের বিভিন্ন স্তরের কর্তাব্যক্তিদের মধ্যেও ভাগবাটোয়ারা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের প্রশ্নÍবনজ সম্পদ রক্ষার দায়িত্বে থাকা একটি চেক স্টেশনই যদি অনিয়ম ও অবৈধ উপার্জনের কেন্দ্র হয়ে ওঠে, তবে প্রতিদিন কাঠ পাচার ও বন উজাড় ঠেকাবে কে?
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কক্সবাজারের সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেন, *"বন বিভাগের নথি ও স্থানীয়দের ধারাবাহিক অভিযোগ থেকে স্পষ্ট যে ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জ চরম হুমকির মুখে। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের শনাক্ত করে দ্রুত অবৈধ দখল উচ্ছেদ ও সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা জরুরি।"*
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জের দায?িত্বপ্রাপ্ত সহকারী বন সংরক্ষক মো. কামরুল হাসান বলেন, *"পাহাড় কাটা, জমি জবরদখল ও গাছ কাটার বিষয়ে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স। ইতিমধ্যে পাকা বাড়িঘর নির্মাণকারীদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে।"*
কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. মারুফ হোসেন জানান, *"বন প্রশাসন যেকোনো অপরাধের বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে। উত্থাপিত অভিযোগগুলো গুরুত্বের সাথে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"*
তবে পরিবেশ সচেতন মহলের মতে, শুধু মুখের ঘোষণা বা দায়সারা মামলা দিয়ে বনাঞ্চল রক্ষা করা সম্ভব নয়। ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জের দখলকৃত জমিতে পূর্ণাঙ্গ জরিপ চালানো, নলবিলা চেক স্টেশনের রেজিস্টার নিরীক্ষা করা এবং জড়িত অসাধু কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
