
দুর্নীতির পথে একমাত্র ‘পথের কাঁটা’গণমাধ্যম

একটি প্রগতিশীল, বৈষম্যহীন এবং উন্নত রাষ্ট্র গঠনের সবচেয়ে বড় অন্তরায় হলো দুর্নীতি। সমাজ ও রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাসা বেঁধে থাকা এই ব্যাধি দূর করার জন্য বিভিন্ন সময়ে নানা আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও, দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে আসছে মুক্ত গণমাধ্যম। বস্তুত, দুর্নীতিবাজদের অবৈধ সাম্রাজ্য বিস্তারের পথে আজ সবচেয়ে বড় ‘পথের কাঁটা’ হিসেবে দাঁড়িয়েছে নির্ভীক ও আপসহীন সাংবাদিকতা।
দুর্নীতি সবসময় সংঘটিত হয় অন্ধকারের আড়ালে, গোপনীয়তার চাদরে। ক্ষমতার অপব্যবহার, অর্থ পাচার, টেন্ডারবাজি আর প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মগুলোর ওপর যখন গণমাধ্যম অনুসন্ধানী নজরদারি চালায়, তখন সেই গোপনীয়তার দেয়াল ভেঙে পড়ে। গণমাধ্যমের প্রধান শক্তি হলো এর জনসমক্ষে প্রকাশের ক্ষমতা (Public Exposure)। যেকোনো প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজের জন্য আইন বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার চেয়েও বড় ভয় হলো গণমাধ্যমে তার মুখোশ উন্মোচিত হয়ে যাওয়া। কারণ, গণমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও আইনি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়।
গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয় গণমাধ্যমকে। এর মূল দায়িত্বই হলো ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা এবং শাসকের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। যখন রাষ্ট্রের অন্যান্য তদারকি প্রতিষ্ঠান শিথিল বা আপসকামিতার আশ্রয় নেয়, তখন গণমাধ্যমই একমাত্র অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে জেগে থাকে। সরকারি খাতের বড় বড় মেগা প্রজেক্টের অনিয়ম থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায়ের আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি—সবই আজ সংবাদকর্মীদের তীক্ষ্ণ লেখনীর মাধ্যমে জনগণের সামনে চলে আসছে।
ডিজিটাল যুগে সাংবাদিকতার ধরন বদলেছে। এখন শুধু তথ্য দেওয়াই নয়, ডেটা অ্যানালিসিস এবং গভীর অনুসন্ধানের মাধ্যমে দুর্নীতির শিকড় উপড়ে আনছে গণমাধ্যম। পানামা পেপারস বা প্যারাডাইস পেপারসের মতো বৈশ্বিক অর্থ পাচারের ঘটনা থেকে শুরু করে দেশের ব্যাংকিং খাতের ঋণ কেলেঙ্কারি—সব ক্ষেত্রেই অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা আলোকপাত করেছেন। ফলে দুর্নীতিবাজরা আর কোথাও নিজেদের নিরাপদ মনে করতে পারছে না।
গণমাধ্যম দুর্নীতির পথের কাঁটা বলেই এই কাঁটাকে উপড়ে ফেলতে যুগে যুগে দুর্নীতিবাজ ও প্রভাবশালী মহল নানা অপকৌশল অবলম্বন করেছে। সাংবাদিকদের হুমকি, ভীতি প্রদর্শন, মিথ্যা মামলা, এমনকি সশরীরে হামলা করার ঘটনাও কম নয়। বিভিন্ন সময়ে কালাকানুন তৈরি করে গণমাধ্যমের মুখ চেপে ধরার চেষ্টাও করা হয়েছে। কিন্তু সত্য প্রকাশের যে সহজাত ধর্ম, তাকে কখনোই পুরোপুরি দমন করা সম্ভব হয়নি। জীবন বাজি রেখেও সাংবাদিকরা সমাজের ক্ষতগুলোকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন।
দুর্নীতিমুক্ত সমাজ বিনির্মাণে গণমাধ্যমের এই ভূমিকা ধরে রাখতে হলে সবার আগে প্রয়োজন সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা দিতে রাষ্ট্রকে আরও আন্তরিক হতে হবে। একই সাথে, গণমাধ্যমকেও কোনো রাজনৈতিক বা কর্পোরেট স্বার্থের কাছে মাথা নত না করে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করে যেতে হবে।
দুর্নীতির অন্ধকার গ্রাস থেকে দেশকে রক্ষা করতে হলে গণমাধ্যম নামক এই শক্তিশালী 'পথের কাঁটা'কে আরও ধারালো এবং কার্যকর করতে হবে। তবেই গড়ে উঠবে একটি জবাবদিহিতামূলক ও স্বচ্ছ বাংলাদেশ।
(লেখক:সম্পাদক,দৈনিক কক্সবাজার একাত্তর।)
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
