
বাঁকখালী নদী রক্ষায় ‘অদ্ভুত’ উদ্যোগ: উদ্ধার জমিতে রিসোর্ট-সুইমিংপুল বানাতে চায় বিআইডব্লিউটিএ

বাঁকখালী নদীকে দখল ও দূষণ থেকে মুক্ত করতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন স্থানীয় পরিবেশকর্মীরা। আদালতের কড়া নির্দেশনায় অভিযান চালিয়ে উচ্ছেদ করা হয়েছিল শত শত অবৈধ স্থাপনা, উদ্ধার হয়েছিল প্রায় ৬৩ একর জমি। কিন্তু নদীটি তার স্বাভাবিক রূপ ফিরে পাওয়ার আগেই এবার সেই জমিতে রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, ইকোপার্ক এবং ‘এশিয়ার বৃহত্তম সুইমিংপুল’ নির্মাণের প্রকল্প হাতে নিয়েছে খোদ সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)।
‘বাঁকখালী নদী সুরক্ষা এবং আনুষঙ্গিক সুবিধাসহ কক্সবাজার (কস্তুরাঘাট) নদীবন্দরের উন্নয়ন প্রকল্প’ শীর্ষক দুই হাজার কোটি টাকার এই প্রস্তাবনা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে পরিবেশবাদী সংগঠন ও সচেতন মহলের মধ্যে।

বিআইডব্লিউটিএর পরিকল্পনা অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া ৬৩ একর জমিতে ওয়াটার ফ্রন্ট ট্যুরিজম বা নৌকেন্দ্রিক পর্যটন গড়ে তোলার নামে ১৫টি বড় ধরনের অবকাঠামোগত কার্যক্রমের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে: কস্তুরাঘাট এলাকায় রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও আধুনিক সুবিধার সুইমিংপুল।নদীর দুই তীরে ওয়াকওয়ে, সংযোগ সড়ক, বেঞ্চ, ছাতা স্থাপন ও রাইড যুক্ত ইকোপার্ক।বাঁকখালী, নুনিয়ারছড়া ও গোরকঘাটা-মহেশখালী ঘাটসহ বিভিন্ন ঘাটের আধুনিকায়ন এবং জেটি-পন্টুন নির্মাণ।
বিআইডব্লিউটিএর যুক্তি, সমুদ্রের ঢেউয়ের তুলনায় নদীতে দুর্ঘটনা ও ঝুকি কম থাকায় এটি পর্যটনের জন্য নিরাপদ। এছাড়া উচ্ছেদকৃত জায়গা খালি পড়ে থাকায় সেখানে নতুন করে আবার অবৈধ দখলদারদের তৈরি হচ্ছে অন্তত ১৫টি নতুন ঘর। তাই নদী ভরাট রোধে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলাই নাকি একমাত্র স্থায়ী সমাধান!
তবে বিআইডব্লিউটিএর এই যুক্তি মানতে নারাজ পরিবেশ কর্মীরা। বিআইডব্লিউটিএর উপপরিচালক (তীরভূমি) মো. আবু ছালেহ কাইয়ুম জানান, প্রস্তাবটি জেলা পর্যায় থেকে পাঠানো হয়েছে এবং এটি এখনো প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) করা এক রিটের প্রেক্ষিতে সম্প্রতি হাইকোর্ট ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বাঁকখালী নদীকে দখল-দূষণমুক্ত করে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করার নির্দেশ দিয়েছেন। রায়ে চার মাসের মধ্যে সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, নদীর সীমানা নির্ধারণ এবং উজাড় হওয়া উপকূলীয় বন পুনর্গঠনের কড়া তাগিদ দেওয়া হয়। এমনকি নদীকে একটি আইনি সত্তা বা ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবেও স্বীকৃতি দিয়েছেন আদালত।
আদালতের রায়ের পর এমন বাণিজ্যিক প্রকল্পের প্রস্তাবকে আদালতের অবমাননা ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ বলছেন পরিবেশকর্মীরা।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রতিক্রিয়ায় বলেন, "কক্সবাজারবাসী ও পরিবেশ আন্দোলনকারীরা নদীটিকে আগের প্রাকৃতিকভাবে ফিরে পাওয়ার জন্য দীর্ঘ আন্দোলন চালিয়ে আসছেন। নদীটি যখন ফিরে পাওয়ার পথ তৈরি হলো, ঠিক সেই মুহূর্তে বিআইডব্লিউটিএর মতো একটি সরকারি সংস্থার রিসোর্ট ও সুইমিংপুল বানানোর প্রস্তাব কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।"
একই মতামত ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কক্সবাজারের সাধারণ সম্পাদক কলিম উল্লাহ। তিনি বলেন, "নদীকে রক্ষা করার বদলে নদীতেই রিসোর্ট ও সুইমিংপুল বানানোর মতো অদ্ভুত প্রকল্প কোনো সুস্থ চিন্তার ফসল হতে পারে না। দ্রুত এই পরিবেশবিধ্বংসী প্রস্তাব থেকে সরে আসার জোর দাবি জানাচ্ছি।"
সংশ্লিষ্টদের মতে, বারবার উচ্ছেদ অভিযানের পর তদারকির অভাবে নদী আবার দখলে চলে যাওয়া প্রশাসনিক ব্যর্থতা। তবে দখল ঠেকাতে নদীর জমিতে কংক্রিটের বাণিজ্যিক অবকাঠামো নির্মাণ নদীটির সুরক্ষার পরিবর্তে তার বিনাশকেই তরান্বিত করবে।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন