
টেকনাফে ২৯ কোটি টাকার হাসপাতাল
মাঝপথেই থমকে গেছে আইসিডিডিআরবি হাসপাতাল

- ঠিকাদার নিখোঁজ
- প্রকৌশলীর দায়সারা বক্তব্য
নিজস্ব প্রতিবেদক:

কক্সবাজারের টেকনাফে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে নির্মাণাধীন আইসিডিডিআরবি হাসপাতাল প্রকল্পের কাজ মাঝপথে থমকে গেছে। নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের গাফিলতি এবং ঠিকাদারের রহস্যজনক পলায়নে প্রকল্পটি এখন ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, কাজ শেষ না করেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই প্রায় ১০ কোটি টাকা বিল তুলে নিয়ে কাজ ফেলে রেখে চলে গেছে।
জানা গেছে, এটি বাংলাদেশ সরকারের একটি নির্দিষ্ট সরকারি বিভাগ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার যৌথ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে বলে। তবে তারা নির্দিষ্ট মানুষদের দিয়ে কাজ করিয়েছেন বলে জানা গেছে। বাংলাদেশ সরকারের স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এই আধুনিক হাসপাতাল কমপ্লেক্সটির সম্পূর্ণ নির্মাণকাজ ও এর সুপারভিশন (তত্ত্বাবধান) পরিচালনা করছে। এলজিইডি তাদের তালিকাভুক্ত ও নির্ধারিত প্রকৌশলী এবং প্রজেক্ট কন্ট্রাক্টরের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের কাজটি সম্পন্ন করছেন বলে জানা যায়।
বরাদ্দ বাড়লেও বাড়েনি কাজের গতি
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালে টেকনাফে এই আইসিআরডিডিবি হাসপাতালের নির্মাণকাজ শুরু হয়। শুরুতে প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ২৭ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হলেও পরবর্তীতে তা বাড়িয়ে প্রায় ২৭ থেকে ২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬ হাজার টাকা করা হয়। ৪৮৮ বর্গমিটার এলাকাজুড়ে নয়টি পৃথক ভবনে এই আধুনিক হাসপাতাল কমপ্লেক্সটি হচ্ছে । চুক্তির শর্তানুযায়ী, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে হাসপাতালের সম্পূর্ণ কাজ শেষ করে তা বুঝিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়সীমা পার হয়ে ২০২৬ সাল চললেও এলজিইডি টেকনাফ এখন পর্যন্ত এই প্রকল্পের কাজ শেষ করতে পারেনি। বর্তমানে হাসপাতালের নির্মাণকাজ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ১৯৮৫-৮৬ সাল থেকে নাফ নদীর তীরে তাঁবু ও পরে বাঁশের তৈরি ৬৫ শয্যার একটি শ্বাসতন্ত্রের রোগ ও ডায়রিয়া হাসপাতাল হিসেবে এটি স্থানীয় জনগণ ও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছে। নতুন স্থায়ী অবকাঠামোর কাজ এই অঞ্চলের প্রায় ৫ লাখ মানুষকে উন্নত চিকিৎসা সুবিধা দেবে। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে এখানে আল্ট্রাসাউন্ড ও স্ক্রিনিং সেন্টারসহ ডায়াগনস্টিক সেবার পরিধিও বাড়ানো হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের যোগসাজশে কাজের কাজ শেষ না করে বিল ছাড় করা হয়েছে। ঠিকাদারকে প্রায় ১০ কোটি টাকা বিল দেওয়া হয়। এই মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি কাজ মাঝপথে ফেলে রেখে সাইট থেকে উধাও হয়ে যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঠিকাদারের এই জালিয়াতির পেছনে এলজিইডির তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পরোক্ষ মদদ ছিল।
প্রকৌশলীর দায়সারা মন্তব্য ও ক্ষোভ
এই নির্মাণকাজ শুরুর সময়ে সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার (এসও) বা উপ-সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন বর্তমান টেকনাফ উপজেলা প্রকৌশলী আলা উদ্দিন। প্রকল্পটির বর্তমান হদিস এবং কাজের এই বেহাল দশা নিয়ে তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অত্যন্ত দায়সারা ও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তিনি প্রতিবেদকের প্রশ্নের জবাবে বলেন, "এসও হয়েছি তো কী হয়েছে, তাদের (ঠিকাদারের) প্রাপ্য আমরা দিয়েছি।" কাজ কেন শেষ হলো না এবং ঠিকাদার কীভাবে কাজ না করে এত বড় অঙ্কের বিল তুলে নিয়ে গেলÍএমন সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাবে কোনো সদুত্তর না দিয়ে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং বলেন, "অফিসে গিয়ে বিস্তারিত জানুন।
এদিকে এই হাসপাতালে যেসব সুবিধা থাকার কথা তা হলো বিশেষায়িত ডায়রিয়া ও জরুরি বিভাগ যা মারাত্মক ডায়রিয়া, কলেরা এবং পানিশূন্যতা আক্রান্ত রোগীদের জন্য রয়েছে শয্যা ও ২৪ ঘণ্টা জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা।
উন্নত ডায়াগনস্টিক ল্যাবরেটরি জন্য আন্তর্জাতিক মানের প্যাথলজিক্যাল ল্যাব, যেখানে রক্ত, মল-মূত্রসহ বিভিন্ন জটিল স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিখুঁতভাবে করা যাবে। ইমেজিং ও রেডিওলজি ইউনিট যা আধুনিক এক্স-রে , আল্ট্রাসনোগ্রাফি এবং হৃদরোগ নির্ণয়ের জন্য ইসিজি সুবিধা। উচ্চ নির্ভরতা ইউনিট জটিল রোগীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত এইচডিইউ বেড।
সাধারণ ও বিশেষায়িত ওয়ার্ড যা ডায়রিয়া ছাড়াও অন্যান্য সাধারণ রোগব্যাধি, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং পুষ্টিহীনতায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য পৃথক ইনডোর ওয়ার্ড। ফার্মাসি ও ইনডোর স্টোর যা ২৪ ঘণ্টা জরুরি ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করতে নিজস্ব ফার্মাসি ও সেন্ট্রাল ড্রাগ ওয়্যারহাউস থাকার কথা।
বায়ো-মেডিক্যাল ও রিচার্জ সেন্টার যা আইসিডিডিআরবি-এর বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি এবং সংগৃহীত নমুনা সংরক্ষণের বিশেষ ব্যবস্থা।
দুর্যোগ সহনশীল ও পরিবেশবান্ধব নকশাএটি হাসপাতালটি এমনভাবে তৈরি করা হওয়ার কথা যা ঘূর্ণিঝড় বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়েও নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা দিতে সক্ষম হবে। অন্যান্য অন-সাইট সুবিধার মধ্যে আধুনিক কিচেন (রন্ধনশালা), লন্ড্রি (লন্ড্রি ভবন) এবং মর্গ বা মরদেহ রাখার হিমাগার সুবিধাও থাকবে। অন্যদিকে হাসপাতালের চিকিৎসক, গবেষক ও জরুরি সাপোর্ট স্টাফদের জন্য কমপ্লেক্সের ভেতরেই উন্নত আবাসন ব্যবস্থা।
দেশের সীমান্ত উপজেলা টেকনাফ। নাফ নদীর তীরে অবস্থিত দুর্গম, পাহাড়ি এবং দুর্যোগ প্রবণ এই এলাকার মানুষ উন্নত চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত বহু বছর ধরে। এই জনপদের মানুষের ডায়রিয়া রোগের চিকিৎসা দিতে ৮৬ সালে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র নামে অস্থায়ী তাঁবু নির্মাণ করে একটি বেসরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান।
২০২০ সালে করোনা মহামারি আকার ধারণ করলে সেখানে অস্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করে ৬৫ শয্যার হাসপাতাল করা হয়। সেই হাসপাতালটিতে বর্তমানেও চিকিৎসা কার্যক্রম চলছে। গেলো বছরের নভেম্বরে হাসপাতালটিকে ২০০ শয্যায় উন্নীত করার পাশাপাশি আধুনিকায়নের কাজ শুরু হয়। এতে খুশি স্থানীয় বাসিন্দারা।
জনগণের স্বাস্থ্যসেবা এখন অনিশ্চিত
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, এডিবির অর্থায়নে আন্তর্জাতিক মানের এই হাসপাতালটি নির্মিত হলে টেকনাফের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবায় বড় ধরনের আমূল পরিবর্তন আসত। কিন্তু সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্বহীনতা ও ঠিকাদারের দুর্নীতির কারণে কোটি কোটি টাকা অপচয় হলেও আলোর মুখ দেখছে না হাসপাতালটি। এ বিষয়ে এলজিইডির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ ও জরুরি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
