
সরকারি চাকরির সীমিত বেতনের আড়ালে কোটি টাকার সম্পদ-উঠছে নানা প্রশ্ন
ড্রাইভার মালেককেও ছাড়িয়ে গেছেন উখিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ফরিদ!

সরকারি নির্মাণসামগ্রী ব্যক্তিগত বাড়িতে ব্যবহার
অ্যাম্বুলেন্স, খাবার ও এনজিওর সরঞ্জাম ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম
তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীর বেতনের সঙ্গে সম্পদের অমিল
খাবার সরবরাহ ও মালামাল ক্রয়ে অনিয়ম
নির্মাণকাজে অনিয়ম ও ৫০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ
হাসপাতালের পুরোনো মালামাল নিলামে অনিয়ম
নিজ ও পরিবারের নামে বিপুল সম্পদ
অনিয়ম, দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের পাহাড়
দুদকের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি স্থানীয়দের
নিজস্ব প্রতিবেদক:
কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী ও অফিস সহকারী কাম হিসাবরক্ষক ফরিদ আলমের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার অনিয়ম, আর্থিক দুর্নীতি এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের পাহাড় গড়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সরকারি চাকরির সীমিত বেতনের বিপরীতে তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মালিক হওয়া নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে চাপা ক্ষোভ ও তীব্র প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অনিয়মের এই মহোৎসব দেখে স্থানীয় অনেকেই মন্তব্য করছেন, তিনি যেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আলোচিত ড্রাইভার মালেককেও হার মানিয়েছেন।

স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ২০ বছর আগে উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগদান করেন ফরিদ আলম। দীর্ঘ দিন ধরে একই কর্মস্থলে থাকার সুবাদে ক্ষমতার দাপটে তিনি একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। রোগীদের নিম্নমানের খাবার সরবরাহ, ভূয়া বিল-ভাউচার প্রস্তুত, পুরোনো মালামাল নিলামে কারচুপি, সরকারি ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম তছরুপ এবং মানবিক সংস্থাগুলোর দেওয়া সামগ্রী আত্মসাৎসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহুতল ভবন ও চিকিৎসকদের কোয়ার্টার নির্মাণের সময় ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশ করে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের সুযোগ করে দেন ফরিদ। বিনিময়ে 'অফিস খরচ' বাবদ প্রায় ৫০ লাখ টাকা পকেটে পুরেন তিনি। এমনকি হাসপাতালের সরকারি ভবন নির্মাণের রড, সিমেন্টসহ নানা সামগ্রী নিজের ব্যক্তিগত বাড়ি তৈরিতে ব্যবহার করেছেন বলেও গুঞ্জন রয়েছে।
স্থানীয়দের তথ্য মতে, হাসপাতাল সংলগ্ন এলাকায় প্রায় ২০ শতক মূল্যবান জমির ওপর চারতলা আলিশান ভবন রয়েছে ফরিদের। কক্সবাজার জেলা শহরে দ্বিতীয় স্ত্রীর নামে রয়েছে জমি ও আলাদা বহুতল বাড়ি। এছাড়া বন বিভাগের বেশ কয়েকটি প্লট বেআইনিভাবে দখল করে রাখার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। তাঁর সন্তানদের বিলাসী জীবনযাপন ও উচ্চশিক্ষার ব্যয় নিয়েও নানা সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর পরিত্যক্ত মালামাল ও হাসপাতালের পুরোনো জিনিসপত্র নামমাত্র মূল্যে নিলামে বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা পকেটস্থ করেছে ফরিদের সিন্ডিকেট। দিনের পর দিন সরকারি অ্যাম্বুলেন্স অচল পড়ে থাকলেও এর নামে নিয়মিত বিল উত্তোলন, এনজিও থেকে পাওয়া চিকিৎসা সামগ্রী গায়েব করা এবং স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মচারীদের বদলি-পদোন্নতি বাণিজ্যের অভিযোগও তাঁর ঝুলিতে রয়েছে।
অভিযুক্ত ফরিদের চারতলা ভবনের কেয়ারটেকার বলেন, “এই বহুতল ভবনটি ফরিদ স্যারের। আমি শুধু দেখাশোনা করি। তিনি কক্সবাজার শহরের বাসায় বেশি থাকেন, এখানে কম আসেন।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের এক কর্মচারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “চাকরির নিরাপত্তার ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না। কিন্তু নিরপেক্ষ তদন্ত হলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে।” স্থানীয় বাসিন্দা হেলাল উদ্দিন বলেন, “হাসপাতালকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতির কথা শুনছি। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্ত করে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে অফিস সহকারী কাম হিসাবরক্ষক ফরিদ আলমের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে হোয়াটসঅ্যাপে লিখিত বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো সদুত্তর দেননি।
এ বিষয়ে উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) ডা. এহেছান উল্লাহ সিকদার বলেন, “ফরিদ আলমের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগের কথা উঠেছে, তা আমার দায?িত্ব গ্রহণের আগের ঘটনা। আমার আমলে তাঁকে কোনো ধরনের কেনাকাটা বা নিলাম সংক্রান্ত কমিটিতে রাখা হয়নি এবং ভবিষ্যতেও রাখার পরিকল্পনা নেই। পূর্বের কোনো বিষয়ে আমার মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।”
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
