
প্রশাসক নির্ভর কক্সবাজার পৌরসভা
সিটি করপোরেশন ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ, পৌরসেবায় চরম আস্থা সংকট

দেশের প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজার পৌরসভাকে ‘সিটি করপোরেশনে’ উন্নীত করার বিভিন্ন সময়ে আশ্বাস ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ঘোষণা এলেও, বাস্তবে তার বিন্দুমাত্র প্রতিফলন নেই নাগরিক সেবায়। ঘোষণার পর বছর গড়ালেও পৌরসভার ১ থেকে ১২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ও এখানে আসা লাখ লাখ পর্যটকের ভাগ্যে জোটেনি কাঙ্ক্ষিত সুযোগ-সুবিধা। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির অনুপস্থিতিতে প্রশাসনিক আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, নিত্যদিনের সুপেয় পানির তীব্র সংকট, ময়লা-আবর্জনা ও অন্ধকারের কারণে পৌরসভার সার্বিক সেবা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। ফলে কর্তৃপক্ষের সিটি করপোরেশনের ফাঁকা আশ্বাসে আর আস্থা রাখতে পারছেন না কক্সবাজার পৌরসভার সাধারণ মানুষ।

পৌর এলাকার ১ থেকে ১২ নম্বর ওয়ার্ডের প্রায় প্রতিটি সড়ক বাতির চরম অব্যবস্থাপনায় রাতে অন্ধকারে ডুবে থাকছে পুরো শহর। বাতি না থাকার সুযোগে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে চোরের উপদ্রব মারাত্মক রূপ নিয়েছে। একই সঙ্গে পর্যটন এলাকা কলাতলী, সুগন্ধা, লাবণী পয়েন্টসহ শহরের প্রধান সড়কগুলোতে রাতের আঁধারে পর্যটকরা প্রতিনিয়ত ছিনতাইকারীর কবলে পড়ছেন। আইন-শৃঙ্খলার এমন চরম অবনতিতে জনমনে যেমন ক্ষোভ বাড়ছে, তেমনি পর্যটনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
পৌরসভার ১ থেকে ১২ নম্বর ওয়ার্ডের অলিগলি থেকে শুরু করে মূল রাস্তার পাশ—সবখানেই জমা হয়ে আছে ময়লা-আবর্জনা। নিয়মিত বর্জ্য পরিষ্কার না করায় তীব্র দুর্গন্ধের সাথে ছড়াচ্ছে মারাত্মক রোগব্যাধি। সীমিত সংখ্যক পরিচ্ছন্নতাকর্মী দিয়ে ১২টি ওয়ার্ডের বিশাল পরিধি সামলাতে একেবারেই হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। অবহেলিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে একটু বৃষ্টিতেই তলিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন এলাকা।
পৌরবাসীর সবচেয়ে বড় ক্ষোভের জায়গা দাপ্তরিক সেবা ও মৌলিক অধিকার প্রাপ্তি। ১-১২ নম্বর ওয়ার্ডে বিশুদ্ধ সুপেয় পানির স্থায়ী সমাধানের কাজ চলমান রয়েছে বলে জানায় পৌরকতৃপক্ষ।
অন্যদিকে পৌরসভা কার্যালয়ে সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষ পদে পদে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
অভিযোগ উঠেছে, জন্ম ও মৃত্যু সনদ,ওয়ারিশ সনদ,বিভিন্ন নাগরিক ও চারিত্রিক প্রত্যয়নপত্রসহ এসব সাধারণ সনদপত্র নিতে গেলেও নির্ধারিত ফি-এর বাইরে টেবিল অনুযায়ী গুণতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। টাকা না দিলে ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে আবেদন, যা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
পৌরএলাকার ৪ নং ওয়ার্ডের ক্ষুব্ধ বাসিন্দা পারভেজ বলেন,সিটি করপোরেশনের কথা শুনে শুনে কান পচে গেল। বাস্তবে রাস্তার বাতি জ্বলে না, বাসায় পানির সাপ্লাই নেই। অথচ শুধু একটা জন্ম সনদের জন্য গেলে টাকা ছাড়া ফাইল নড়েই না। আমরা কি ট্যাক্স দিই না? নির্বাচিত প্রতিনিধি থাকলে তাও জবাবদিহিতা থাকে, এখন তো প্রশাসক আর কর্মচারীদের স্বেচ্ছাচারিতায় আমরা জিম্মি।"
পৌরএলাকার ৫ নং ওয়ার্ডের ক্ষুব্ধ বাসিন্দা মহিউদ্দিন শেখ বলেন,"সন্ধ্যা নামলেই সড়কগুলো অন্ধকার হয়ে যায়। অলিগলিতে ছিনতাই আর চোরের ভয়ে মানুষ বের হতে পারছে না। দোকানপাট তাড়াতাড়ি বন্ধ করতে হয়। পর্যটকরা এসে আতঙ্কে ভোগে। বড় বড় ঘোষণার চেয়ে আগে তো সড়ক বাতি আর সিকিউরিটি ঠিক করা দরকার।"
পৌরএলাকার ৩ নং ওয়ার্ডের ক্ষুব্ধ গৃহিণী কামরুন নাহার বলেন,বাড়ির সামনে ময়লার স্তূপ। ড্রেন উপচে পানি রাস্তায় এসে জমা হচ্ছে, মশার কামড়ে ঘরে টেকাই দায়। পৌরসভার লোকজনের কাছে গেলে বলে জনবল নেই। সিটি করপোরেশন বানিয়ে কী লাভ যদি আমরা প্রতিদিনের বর্জ্য অপসারণ আর সুপেয় পানিটুকু না পাই?"
নির্বাচিত প্রতিনিধি ছাড়া আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় প্রশাসক দিয়ে পৌরসভার এত বড় সেবা ব্যবস্থা সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ১ থেকে ১২ নম্বর ওয়ার্ডের সার্বিক নাগরিক সুবিধা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সড়ক বাতি নিশ্চিত করা, সনদ বাণিজ্যের নামে চলা ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ এবং সুপেয় পানি সরবরাহ চালু করা না হলে দ্রুতই কক্সবাজার পৌরবাসী বড় ধরনের আন্দোলনের পথ বেছে নেবেন বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
