
চকরিয়ায় সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও পরিবেশ ধ্বংসের মহোৎসব: কাঠ-বালি লুটে বেপরোয়া ‘মোহাম্মদ আলী লিটন’ চক্র

কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী ও ফুলছড়ি রেঞ্জের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে চলছে নির্বিচারে বনভূমি জবরদখল, অবৈধভাবে মাটি-বালি উত্তোলন এবং পরিবেশ ধ্বংসের নানামুখী তাণ্ডব। সরকারি বনভূমি ও বনায়ন রক্ষায় প্রধান বন সংরক্ষক ও মন্ত্রণালয় থেকে কড়া নির্দেশনা এবং একের পর এক মামলা সত্ত্বেও থামছে না এই চক্রের দৌরাত্ম্য। বন দখলের এই মহোৎসবে স্থানীয় এলাকাবাসীর মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ বিরাজ করছে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং প্রধান বন সংরক্ষকের কার্যালয় থেকে ‘সরকারি বনভূমি ও বনায়ন রক্ষার্থে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ প্রসঙ্গে’ জরুরি নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। গত সেপ্টেম্বর মাসে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় থেকে কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কাছে পাঠানো চিঠিতে চলতি বছরের ১ নভেম্বরের মধ্যে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
তবে নির্ধারিত সময় পার হলেও এখন পর্যন্ত কক্সবাজার বন বিভাগ কোনো তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. মারুফ হোসেন জানান, তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে একজন সহকারী বন সংরক্ষককে নিযুক্ত করা হয়েছে এবং তিনি শীঘ্রই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করবেন। অভিযুক্তদের বিষয়ে তিনি বলেন, “তার নামে তো আমরা একাধিক মামলা করেছি। মামলা করার পর ব্যবস্থা নেওয়া আদালতের বিষয়।”
স্থানীয় বাসিন্দা, বন বিভাগের নথি, থানায় দায়ের হওয়া মামলা এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে দেওয়া অভিযোগপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সংরক্ষিত বনভূমি দখল করে মুরগির খামার, ফলের বাগানসহ বিভিন্ন স্থায়ী স্থাপনা গড়ে তুলছে। খুটাখালী ইউনিয়নের নরপাড়ি, গোদারপাড়ি, হরিখোলা ও কচুতলিয়া এলাকায় সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বিস্তীর্ণ অংশ জবরদখল করা হয়েছে। বনের স্বাভাবিক গাছপালা কেটে জমি সমতল করে এসব অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে, যা জীববৈচিত্র্যকে মারাত্মভাবে হুমকির মুখে ফেলছে।
বিশেষ করে খুটাখালী মৌজার বন বিভাগের ২ নম্বর খতিয়ানের আরএস ৬১ ও বিএস ৭০ দাগের আওতাধীন প্রায় ১৫ একর সরকারি বনভূমি—যা দীর্ঘদিন ধরে ঘন সালবাগান ও গবাদিপশুর চারণভূমি ছিল—সেখানকার সালগাছ কেটে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ফলের বাগান তৈরি করা হয়েছে বলে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এলাকাবাসীর লিখিত আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বন দখলের পাশাপাশি খুটাখালী ছড়া, খাল ও বসতভিটার আশপাশে দিন-রাত ড্রেজার ও স্কেভেটর চালিয়ে অবৈধভাবে বালি ও মাটি উত্তোলন করা হচ্ছে। এর ফলে মারাত্মক ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে স্থানীয় বসতবাড়ি, কৃষিজমি এবং সংরক্ষিত বনাঞ্চল। গত ২৪ জুলাই খুটাখালী ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দিয়ে মোহাম্মদ আলী লিটনের নেতৃত্বে আট সদস্যের একটি চক্রের বিরুদ্ধে এই অবৈধ বালি-মাটি উত্তোলনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করেন।
এছাড়াও গত ২৩ জুলাই চকরিয়া থানায় দায়ের হওয়া একটি মামলায় লিটনসহ ৮-১০ জনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র হামলার অভিযোগ আনা হয়। ভুক্তভোগী আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইয়াসমিন আক্তার হ্যাপী অভিযোগ করেন, লিটন ও তার সহযোগীরা দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে আসছেন। তার মহিষের পাল ওই এলাকায় গেলে একটি বাছুরকে কুপিয়ে হত্যা করা হয় এবং আরেকটি মহিষ নিখোঁজ রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
প্রতিবেদকের হাতে আসা বন বিভাগের নথি অনুযায়ী, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে মোহাম্মদ আলী লিটন এবং তার ভাই মো. ইব্রাহিমসহ সহযোগীদের বিরুদ্ধে হরিখোলা, গোদারপাড়ি ও কচুতলিয়া এলাকায় অবৈধ প্রবেশ, গাছ কাটা, বালি ও মাটি পাচারের অভিযোগে একাধিক বন মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ ছাড়া সংবাদে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে চকরিয়া জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আনোয়ারুল করিম স্বপ্রণোদিত হয়ে একটি মামলা দায়ের করেছেন।
সকল অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান অভিযুক্ত **মোহাম্মদ আলী লিটন** নিজের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, *"আমি বন দখল, বালি উত্তোলন কিংবা কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নই। একটি মহল আমাকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন ও ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা অভিযোগ ও অপপ্রচার চালাচ্ছে।"
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কক্সবাজারের সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম নজরুল ইসলামের মতে, বন বিভাগের নথি, মামলা এবং এলাকাবাসীর ধারাবাহিক অভিযোগ থেকে পরিষ্কার যে খুটাখালী ও ফুলছড়ি রেঞ্জের সংরক্ষিত বনাঞ্চল ক্রমেই ধ্বংসের মুখে পড়ছে। পরিবেশ রক্ষা ও সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে বনভূমি দখলমুক্ত করা, অবৈধ বালি উত্তোলন বন্ধ এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করার জোর দাবি জানিয়েছেন তিনি ও স্থানীয় সচেতন মহল।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
