
সীমান্তে মাদক কারবার ও ক্ষমতার অপব্যবহার: রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া আবুল ফয়েজকে নিয়ে এলাকায় চাঞ্চল্য

- ** শৈশবের কষ্টের দিন থেকে মাদকের সিন্ডিকেট
- ** বিজিবির 'সোর্স' পরিচয় ও রাজনৈতিক দলবদল
- ** নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ ও বিলাসবহুল গাড়ি
নিজস্ব প্রতিবেদক:
একসময় যিনি দিনমজুরের কাজ ও নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন, সময়ের ব্যবধানে সেই আবুল ফয়েজ এখন বিপুল সম্পদের মালিক। মিয়ানমার সীমান্তকেন্দ্রিক ইয়াবা কারবার, বিজিবির কথিত 'সোর্স' পরিচয় এবং রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের মাধ্যমে তার এই অস্বাভাবিক অর্থবিত্ত গড়ার অভিযোগ উঠেছে। কক্সবাজারের উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব ফারিরবিল আনজুমানপাড়ার মৃত আবুল বশরের ছেলে এই ফয়েজকে ঘিরে বর্তমানে স্থানীয় এলাকায় তীব্র আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় বইছে।

স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ফয়েজের ছোটবেলা কেটেছে চরম আর্থিক অনটনে। তার বাবা মরহুম আবুল বশর ছিলেন দিনমজুর। পেটের দায়ে ফয়েজ কখনো ইটভাটায় শ্রমিকের কাজ করেছেন, আবার কখনো নদীতে মাছ ধরে সংসার চালিয়েছেন। পরিবারের অবস্থা ফেরাতে তার বাবা সৌদি আরব গেলেও সেখানে তার মৃত্যুর পর সংসারের পুরো চাপ এসে পড়ে ফয়েজের ওপর।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে মাদক ও অস্ত্র মামলার আসামি বাবুল মেম্বারের গড়া একটি মাদক সিন্ডিকেটে জড়িয়ে পড়েন ফয়েজ। ওই চক্রের সাথে মিয়ানমারের শীর্ষ মাদক কারবারি রোহিঙ্গা নবী হোসেনের যোগসাজশ ছিল। ফয়েজের সাথে তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ছাড়াও রিদুয়ান ও রুবেলসহ বেশ কয়েকজন এই সিন্ডিকেটে কাজ করতেন। পরবর্তীতে ২০১৯ সালের দিকে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বিরোধ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই চক্র ভেঙে যায় এবং তারা পৃথকভাবে মাদক ও স্বর্ণ চোরাচালানে জড়িয়ে পড়েন। ফয়েজের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় রিদুয়ান বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ র্যাবের হাতে আটকও হয়েছিলেন বলে স্থানীয়রা জানান।
পালংখালী সীমান্তবর্তী এলাকায় বসবাসের সুযোগ নিয়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর কিছু সদস্যের সাথে সখ্য গড়ে তোলেন ফয়েজ। এরপর থেকেই নিজেকে ‘বিজিবির সোর্স’ পরিচয় দিয়ে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব ও প্রভাব বিস্তার শুরু করেন। অভিযোগ রয়েছে, এই পরিচয়ের আড়ালে মিয়ানমার থেকে আসা মাদকের বড় বড় চালান সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে খালাস ও নিরাপদে সরবরাহের নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি। মাঝেমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে কিছু চালান ধরিয়ে দেওয়ার আড়ালে নিজের অন্য চালানগুলো পার করার সুযোগ তৈরি করা হয় এবং জব্দ করা মাদকের অংশ আত্মসাতেরও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
রাজনৈতিক পরিচয়ের বিষয়ে জানা যায়, গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতাদের সাথে সখ্য বজায় রাখলেও রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর তিনি কৌশলে ইউনিয়ন যুবদলের সাংগঠনিক পদ বাগিয়ে নেন। মাদক কারবার ও অবৈধ কার্যক্রম নিরাপদ রাখতে রাজনৈতিক পরিচয়কে তিনি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি বিএনপির একটি মিছিলে তার কোমরে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শনের দাবিও করেছেন এক স্থানীয় জনপ্রতিনিধি।
ফয়েজের আকস্মিক সম্পদের পাহাড় গড়ার বিষয়টি এলাকাবাসীকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়ে তুলেছে। স্থানীয়দের দাবি, পালংখালীর মোছারখোলা এলাকায় প্রায় আট একর পিএফ জমি কিনেছেন তিনি। এ ছাড়াও পরিবারের বিভিন্ন সদস্যের নামে বেনামে জমি রয়েছে। মাদক পরিবহনে ব্যবহৃত হয় এমন অভিযোগ তুলে এক্স-বক্সি ব্র্যান্ডের একটি ‘নোহা’ গাড়ি নিয়ে এলাকায় নানা গুঞ্জন রয়েছে।
এ বিষয়ে স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, "ফয়েজ ও তার পরিবারের অস্বচ্ছল অবস্থা সবাই দেখেছে। কিন্তু হঠাৎ তাদের এমন আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার পেছনে বড় কোনো অবৈধ ব্যবসার হাত রয়েছে। দৃশ্যমান কোনো বৈধ আয় না থাকলেও তাদের জমি ও গাড়ির অভাব নেই। এসব সম্পদের উৎস অবশ্যই অনুসন্ধান করা দরকার।"
সকল অভিযোগের বিষয়ে আবুল ফয়েজের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, *"আমার কোনো গাড়ি কিংবা এত সম্পদ নেই।"* তবে বিএনপি নেতার সাথে সংশ্লিষ্ট ও এলাকায় আলোচিত ‘নোহা’ গাড়িটির মালিকানা ও ব্যবহার সম্পর্কে তিনি কোনো সদুত্তর বা স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
সীমান্তে মাদক পাচার, কথিত সোর্স পরিচয় ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অবৈধ সম্পদ অর্জনের এই পুরো ঘটনার সুনির্দিষ্ট ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
