
মধ্যবিত্তের জিম্মি জীবন: নীরব আত্মসমর্পণের এক ট্র্যাজিক চিত্র

“আমি সেই মধ্যবিত্ত, যে জাগেও না, মরে না, শুধু বাঁচে একটা চাকরির লোভে, একটা সস্তা কুর্নিশে, একটা ভাঙা ঈশ্বরে!
আমি সেই মুখোশধারী, যে চোখে জল রাখে না, কাঁদতেও জানে না, শুধু হিসেব রাখে, কতটুকু চুপ থাকলে পেট চলে!...”

কক্সবাজারের নিজস্ব কবিতার ক্যানভাসে ফুটে উঠলেও কবি ও সাংবাদিক জসিম উদ্দিনের ‘*মধ্যবিত্তের জিম্মি জীবন*’ কবিতাটি মূলত কোনো একক আঞ্চলিক চিত্র নয়। এটি আজকের সমগ্র বাংলাদেশ ও আধুনিক সমাজবাস্তবতার এক নির্মম ও নগ্ন দর্পণ।গত ৩ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত এই কবিতাটি কেবল কয়েক ছত্রের ছন্দোবদ্ধ বাক্য নয়; এটি দেশের এক বিশাল জনসংখ্যা, অর্থাৎ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অবদমিত দীর্ঘশ্বাস, নীরব আত্মসংগ্রাম আর বেঁচে থাকার আপ্রাণ আপসের এক করুণ দলিল।
আমাদের সমাজে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর আসল পরিচয় কী? এরা সমাজের সেই অংশ, যারা দিনশেষে আত্মসম্মানবোধের শক্ত খোলসে বন্দি থেকে নিজের হাড়ভাঙা খাটুনি আর জমানো স্বপ্নগুলোকে প্রতিদিন বিসর্জন দেয়। কবি খুব নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করেছেন— এই শ্রেণী চাইলেও বিদ্রোহী হতে পারে না। কারণ, তাদের সামান্য সামাজিক প্রতিবাদ বা হকের কথার বিনিময়ে সন্তানকে স্কুল থেকে নামিয়ে দিতে হয়, কিংবা পরিবার সামলাতে গিয়ে চাকরিটা হারিয়ে পথে বসতে হয়। বাজারের আগুনদাম, গ্যাসের চড়া বিল, কিংবা শিক্ষার বিপুল খরচের কাছে তাদের যাবতীয় নৈতিক প্রতিবাদ থমকে দাঁড়ায়।
আজকের বাস্তবতায় মধ্যবিত্তের প্রতিদিনের যুদ্ধটা কেবল কোনোমতে বেঁচে থাকার। যেখানে কবিতার কাল্পনিক ‘স্বাধীনতা’ আর তাদের কঠিন জীবনের ‘বাস্তবতা’ একে অপরের সাথে বিন্দুমাত্র মেলে না। স্বাধীনতা এদের কাছে পরম কোনো প্রাপ্তি হয়ে উঠতে পারে না; কারণ স্বাধীনতা দিয়ে অন্তত মাসের শেষের খালি পকেট কিংবা নিত্যপণ্যের আকাশছোঁয়া দাম মেটানো যায় না। তাই তারা অন্যায় বা রক্তের প্রতিবাদের চেয়ে সুপারশপের ‘ডিসকাউন্ট’ বা সন্তানের ‘কোচিং ফিস’ মিলোতেই সর্বশক্তি ব্যয় করতে বাধ্য হয়।
সবচেয়ে মর্মান্তিক সত্য ফুটে উঠেছে কবিতার শেষ চরণে— যেখানে নিজের সন্তানকেও এই দাসত্ব ও নীরব আত্মসমর্পণের পাঠ দেওয়ার আক্ষেপ প্রকাশ করা হয়েছে:“বাঁচতে হলে মুখ বন্ধ রাখিস, বাপ!”
শিক্ষা, ধর্ম, সংবাদ মাধ্যম কিংবা রাজনীতি— প্রতিটা সামাজিক স্তম্ভের কাছে মধ্যবিত্ত আজ ব্যবস্থার নামে জিম্মি। নিজের মেরুদণ্ড সোজা রেখে দাঁড়ানোর সুযোগটুকুও বর্তমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তাদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে। তারা প্রতিবাদ করতে গেলে ব্যবস্থা তাদের চূর্ণ করে দেয়, আবার চুপ থাকলে তারা ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে মরে।
আজ মধ্যবিত্ত শ্রেণী এমন এক চক্রের শিকার, যা সমাজের অর্থনীতির চাকা সচল রাখে, অথচ সেই চক্রেই তারা সবচেয়ে বেশি নিষ্পেষিত হয়। কোনো সমাজ যদি তার মধ্যবিত্তকে এতটা জিম্মি আর আত্মমর্যাদাহীন করে তোলে, তবে সেই সমাজের সামাজিক স্থায়িত্ব ও ভবিষ্যৎ কতটা অন্ধকার, তা গভীরভাবে ভাববার সময় এসেছে। দৈনিক যুগান্তরে জসিম উদ্দিনের এই কাব্যিক আর্তি তাই কেবল কাব্যচর্চা নয়, বরং আমাদের তথাকথিত অর্থনৈতিক অগ্রগতির সুউচ্চ ইমারতের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক মস্ত বড় প্রশ্নচিহ্ন।
লেখক:সম্পাদক,দৈনিক কক্সবাজার ৭১।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
