
বনভূমি দখল আর পাহাড় কেটে বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগ
উখিয়া বন বিভাগের ঘুম ভাঙবে কবে

- দৃশ্যমান কঠোর পদক্ষেপ নেই বন রক্ষকদের
- দালালচক্রের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করে বন কর্মকর্তারা
- রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বনভূমি দখল
- অভিযান শেষে দখলমুক্ত জমির সুরক্ষা কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে?
এম,এস রানা:

কক্সবাজারের উখিয়ায় সরকারি বনভূমি দখল, পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি, অবৈধ করাতকল (স’মিল) স্থাপন এবং বনভূমিতে বসতবাড়ি ও বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বন বিভাগের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান, মামলা, করাতকল জব্দ ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়া হলেও এসব কর্মকাণ্ড পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না। বরং বনভূমিতে বহুতল ভবন ও ডুপ্লেক্স বাড়ি নির্মাণের অভিযোগ ঘিরে বন বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকেরা।
তাঁদের অভিযোগ, বন বিভাগের পরিচয় ব্যবহার করে একটি দালালচক্র বনভূমিতে বাড়িঘর নির্মাণে সহযোগিতার নামে অর্থ আদায় করছে। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে বনভূমিতে বহুতল ভবন নির্মাণের সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য ছাড়া এর সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
এদিকে উপজেলার রাজাপালং ইউনিয়নের কুতুপালং পূর্বপাড়া এলাকার স্বর্ণ পাহাড়ে বনবিভাগের জমি দখল করে পাঁচতলা ভবন নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে মোহাম্মদ হারুন ও তার ভাই মোহাম্মদ মামুনের বিরুদ্ধে। ইতোমধ্যে ভবনটির অন্তত তিনতলা পর্যন্ত নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, এ ঘটনায় বনবিভাগের পক্ষ থেকে বন মামলা করা হলেও তা কার্যকর উচ্ছেদ অভিযান কিংবা দৃশ্যমান কঠোর পদক্ষেপে রূপ নেয়নি। বিভিন্ন পত্রিকায় ভবন নির্মাণ ও বনভূমি দখল নিয়ে একাধিক সংবাদ প্রকাশিত হলেও ভবনটির বিরুদ্ধে বড় ধরনের কোনো অভিযান পরিচালিত হয়নি বলে দাবি স্থানীয়দের।
রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত ভবনটি উচ্ছেদ কিংবা নির্মাণকাজ পুরোপুরি বন্ধে নতুন কোনো দৃশ্যমান বিভাগীয় পদক্ষেপ দেখা যায়নি বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। ফলে সংরক্ষিত বনভূমিতে বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগের পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ বাড়ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কুতুপালং পূর্বপাড়া এলাকার স্বর্ণ পাহাড়ে সংরক্ষিত বনভূমির একটি অংশ দখল করে পাঁচতলা ভবন নির্মাণের জন্য ফাউন্ডেশন তৈরি করা হয়। এরপর ধাপে ধাপে নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া হয়। বর্তমানে ভবনটির অন্তত তিনতলা পর্যন্ত নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বন বিভাগের পরিচয় দিয়ে একটি দালালচক্র বনভূমিতে বসতবাড়ি, বহুতল ভবন ও ডুপ্লেক্স বাড়ি নির্মাণে সহযোগিতার কথা বলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করছে। অভিযোগ রয়েছে, অর্থের বিনিময়ে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়।
সচেতন নাগরিকদের প্রশ্ন, সরকারি বনভূমিতে যদি অবৈধভাবে ভবন নির্মাণের সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নজরদারি কোথায়? কোনো স্থাপনা নির্মাণের আগে জমির মালিকানা, বনভূমির শ্রেণি এবং নির্মাণের বৈধতা যাচাই করা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
তবে বন বিভাগের কোনো কর্মকর্তা অর্থের বিনিময়ে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণে সহযোগিতা করেছেন—এমন অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রমাণ ছাড়া কাউকে দায়ী করা যায় না।
উখিয়ায় পাহাড় কেটে মাটি সংগ্রহের অন্যতম কারণ হিসেবে স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন নির্মাণকাজে মাটির চাহিদার কথা উঠে এসেছে। বসতবাড়ি নির্মাণ, জমি ভরাট ও অন্যান্য অবকাঠামোগত কাজে মাটির প্রয়োজন থাকলেও সেই চাহিদা পূরণে পাহাড় কাটা বন্ধের পাশাপাশি বিকল্প উৎস নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকেরা।
তাঁদের মতে, শুধু পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে মামলা ও জরিমানা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। কোথা থেকে বৈধভাবে মাটি সংগ্রহ করা যাবে, কীভাবে পরিবেশের ক্ষতি না করে মাটির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব এবং এ ক্ষেত্রে কোন দপ্তর দায়িত্ব পালন করবে—এসব বিষয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।
দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত খাল খনন করে উপযুক্ত মাটি নির্ধারিত নিয়মে ব্যবহারের সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে। তবে এ ধরনের উদ্যোগের আগে পরিবেশগত প্রভাব, খালের স্বাভাবিক প্রবাহ, ভূমির মালিকানা ও প্রযোজ্য আইন যাচাই করা জরুরি।
বনাঞ্চল রক্ষায় অবৈধ করাতকলের বিরুদ্ধে অভিযান ও কাঠ জব্দের পাশাপাশি কাঠের বৈধ সরবরাহব্যবস্থা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় পর্যায়ে বসতবাড়ি নির্মাণ ও সংস্কারসহ বিভিন্ন কাজে কাঠের চাহিদা রয়েছে। এ চাহিদা পূরণে বৈধ উৎস থেকে কাঠ সংগ্রহ, অনুমোদিত করাতকলের কার্যক্রম নিশ্চিত করা এবং অবৈধ কাঠের ব্যবসা বন্ধে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকেরা।
অবৈধ করাতকল থেকে জব্দ করা কাঠের উৎসও যাচাই করা জরুরি। কারণ, জব্দ করা কাঠের সবটাই সরকারি বনের গাছ থেকে এসেছে—এমন সিদ্ধান্ত প্রমাণ ছাড়া দেওয়া যায় না। কাঠের উৎস, মালিকানা ও সংশ্লিষ্ট নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করার দাবি উঠেছে।
উখিয়ার বনভূমিতে বসতি স্থাপনের বিষয়টি নিয়েও রয়েছে নানা বাস্তবতা। স্থানীয় সচেতন মহলের আলোচনায় বনভূমিতে বসবাসকারীদের কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে।
একটি শ্রেণি দীর্ঘদিন ধরে বাপ-দাদার আমল থেকে সেখানে বসবাস করছে। আরেকটি শ্রেণির দাবি, পৈতৃক ভিটায় পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় তারা বসতবাড়ি সম্প্রসারণ করছে। অন্যদিকে অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল কিছু ব্যক্তি বনভূমিতে বড় বাড়ি, ডুপ্লেক্স ও বহুতল ভবন নির্মাণ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব শ্রেণির প্রত্যেকের জমির মালিকানা, বসবাসের ইতিহাস ও নির্মাণের বৈধতা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। দীর্ঘদিনের বসতি ও নতুন করে বনভূমি দখল করে বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণকে একইভাবে বিবেচনা না করে আইনসম্মত ও মানবিক সমাধানের দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকেরা।
বনভূমি রক্ষায় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিভিন্ন সময়ে বাধা, হুমকি ও হামলার শিকার হয়েছেন বলে স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বনভূমি দখল কিংবা উচ্ছেদ অভিযান বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগও আলোচনায় এসেছে।
সচেতন মহলের মতে, বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আইন প্রয়োগে প্রশাসনিক সহায়তা দেওয়া এবং অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। একই সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা দায়িত্বে অবহেলা করলে বা অনিয়মে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধেও বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
সচেতন নাগরিকদের মতে, বনভূমি রক্ষার দায়িত্ব বন বিভাগের হলেও পাহাড়ি মাটি, কাঠ, বসতি ও অবকাঠামোগত চাহিদার সঙ্গে একাধিক সরকারি দপ্তরের কার্যক্রম জড়িত। ফলে শুধু বন বিভাগের অভিযান ও মামলার ওপর নির্ভর করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
সচেতন মহলের অভিযোগ, অভিযান ও আইনি পদক্ষেপের পরও বনভূমিতে নতুন স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ ওঠায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে- অভিযান শেষে দখলমুক্ত জমির সুরক্ষা কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে? যারা নতুন করে পাহাড় কাটছে কিংবা বনভূমি দখল করছে, তাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধব্যবস্থা কতটা কার্যকর?
এ ক্ষেত্রে বন বিভাগ, উপজেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, ভূমি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি বনভূমির সীমানা নির্ধারণ, অবৈধ স্থাপনার তালিকা তৈরি, দখলমুক্ত জমি পুনরায় দখল ঠেকানো এবং বনভূমিতে বসবাসকারীদের বিষয়ে আইনসম্মত পুনর্বাসন বা বিকল্প ব্যবস্থার সম্ভাবনা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
উখিয়ার বনভূমি রক্ষায় সচেতন নাগরিকদের দাবি, সরকারি বনভূমিতে নির্মিত বহুতল ভবন, ডুপ্লেক্স বাড়ি, করাতকল ও অন্যান্য স্থাপনার বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। বন বিভাগের পরিচয়ে অর্থ আদায়কারী দালালচক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে এবং কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
একই সঙ্গে পাহাড় কাটার বিকল্প হিসেবে পরিবেশসম্মত মাটির উৎস নির্ধারণ, কাঠের বৈধ সরবরাহব্যবস্থা, দীর্ঘদিনের বসতির বিষয়ে বাস্তবসম্মত নীতিমালা এবং বনভূমি রক্ষায় সব সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
বনভূমি রক্ষা শুধু উচ্ছেদ অভিযান বা মামলা দায়েরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বনভূমি দখলের কারণ চিহ্নিত করা, অবৈধ সুবিধাভোগীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং স্থানীয় মানুষের বৈধ চাহিদা পূরণে বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই হতে পারে উখিয়ার বনাঞ্চল রক্ষার দীর্ঘমেয়াদি পথ।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
