advertisement

বৃষ্টি উপেক্ষা করে কৃষকদের দীর্ঘ লাইন, ৭ কানি জমিতে বরাদ্দ মাত্র ১০ কেজি!

সার সংকটে উখিয়ার প্রান্তিক কৃষকরা

মোবারক উদ্দিন নয়ন

মোবারক উদ্দিন নয়ন

অক্টোবর ০১, ২০২৬, ১০:৫০

সার সংকটে উখিয়ার প্রান্তিক কৃষকরা
ছবি: সংগৃহীত

শাকুর মাহমুদ:


কক্সবাজারের উখিয়ায় আমন মৌসুমে সার সংকট ও বিতরণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে স্থানীয় কৃষকরা। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও অনেক কৃষক চাহিদা অনুযায়ী সার না পেয়ে আংশিক সার নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। আবার কেউ কেউ সার না পেয়েই ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর- ২০২৬) উখিয়া সদর স্টেশনে সার ডিলারদের দোকানের সামনে ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে দীর্ঘ সময় ধরে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে কৃষকরা প্রয়োজন অনুযায়ী সার পারননি, কেউ কেউ আংশিক পেলেও তা সঠিক ফসলের কাজে আসবে না বলে কৃষক আলী হোসেন জানান। আবার অনেকেই না-পেয়ে ফিরছেন ঘরে।

featured banner

উপজেলা কৃষি-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, চলতি আমন মৌসুমে উখিয়ায় প্রায় ৯৭০.৫ হেক্টর জমিতে আমন চাষাবাদ হচ্ছে। বিপরীতে সর্বশেষ বরাদ্দ এসেছে প্রায় ৯৬ মেট্রিক টন সার। উপজেলার সার বিতরণ ব্যবস্থায় রয়েছেন ৯ জন ডিলার ও ৪২ জন সাব-ডিলার।

কৃষকদের অভিযোগ, জমির পরিমাণ ও ফসলের প্রয়োজন অনুযায়ী সার পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে বরাদ্দ ও বিতরণে সামঞ্জস্য দেখা যাচ্ছে না। ফলে সার সংগ্রহ করতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও অনেক কৃষককে প্রয়োজনের তুলনায় কম সার নিয়ে ফিরতে হচ্ছে।

একজন কৃষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ধান ফলাতে জমি প্রস্তুত করেছি, বীজতলা করেছি, শ্রমিকের খরচ দিয়েছি। এখন সময়মতো সার না পেলে পুরো পরিশ্রমই ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। দিনের পর দিন লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও যদি প্রয়োজনীয় সার না পাই, তাহলে কৃষক যাবে কোথায়?

উপজেলায় শস্য কৃষকের সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ১৯ হাজারের ও বেশি, সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়। অন্যদিকে মৎস্যচাষি প্রায় ২ হাজার ৬০০ জন এবং প্রাণিসম্পদ খাতের কৃষক/খামারির সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৩ হাজারে দাঁড়িয়েছে।

কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ- তিনটি খাতেই মানুষের সম্পৃক্ততা থাকলেও সামগ্রিকভাবে কৃষি ব্যবস্থাপনা ও ভবিষ্যৎ চাহিদা অনুযায়ী পরিকল্পনা কতটা সমন্বিত, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

কৃষকের অভিযোগ, উৎপাদন মৌসুম শুরুর আগেই জমির পরিমাণ, ফসলের ধরন ও কৃষকের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে সারসহ কৃষি উপকরণের পরিকল্পিত সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় সংকট দেখা দেওয়ার পর তৎপরতা শুরু হয়।

সার বিতরণ ব্যবস্থায় ডিলার ও সাব-ডিলারদের ভূমিকা নিয়েও বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। কৃষকদের একটি অংশের অভিযোগ, কোথাও কোথাও বিতরণে অনিয়ম, সমন্বয়হীনতা ও কারসাজির কারণে প্রকৃত কৃষকরা ভোগান্তিতে পড়ছেন।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নেওয়া জরুরি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং সার বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন কৃষকরা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আগের তুলনায় আইনশৃঙ্খলা ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে কার্যকর তদারকি কমে গেছে। আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কিছু কর্মকর্তার খামখেয়ালি বা দায়িত্ব পালনে ঘাটতির অভিযোগও রয়েছে।

বিশেষ করে কৃষি অফিসের তদারকি, সার বরাদ্দ ও বিতরণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কৃষি কর্মকর্তা, ডিলার ও প্রশাসনের বক্তব্য জানা এবং মাঠপর্যায়ে তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজারের সীমান্ত উপজেলা উখিয়ায় বর্তমানে রোপা আমন ধান খেতে সার প্রয়োগের উপযুক্ত সময় চলছে। কিন্তু বিসিআইসি ও বিএডিসি অনুমোদিত সার ডিলার এবং খুচরা বিক্রেতাদের কাছে গিয়ে পর্যাপ্ত উপসেট ও রাসায়নিক সার পাচ্ছেন না কৃষকরা। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে কিংবা একাধিকবার ঘুরেও মিলছে না প্রয়োজনীয় ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমপিও সার।

উপজেলার একাধিক ক্ষুব্ধ কৃষক অভিযোগ করে বলেন, "যেখানে এক কানি জমিতেই প্রায় ২০ থেকে ২৫ কেজি সারের প্রয়োজন হয়, সেখানে ৭ কানি আমন চাষের জন্য আমাদের মাত্র ১০ কেজি সার মেপে দেওয়া হচ্ছে। এটুকু সার দিয়ে খেতের এক কোণাও পূরণ হয় না। সারের অভাবে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে এবং ধানগাছ হলুদ হয়ে মরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।"

কৃষকদের দাবি, সরকারিভাবে সারের পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে। সার ডিলাররা নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে খোলা বাজারে বা গোপনে সার বিক্রি করে দিচ্ছেন বলে অভিযোগ তোলেন তারা। সারের এমন অনিয়ম ও চরম সংকট চলতে থাকলে চলতি মৌসুমে আমন ধানের কাঙ্ক্ষিত ফলন বিপর্যয় ঘটবে, যা তাদের মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলবে।

সার সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে স্থানীয় কৃষি বিভাগ জানায়, বরাদ্দকৃত সার সঠিক প্রক্রিয়ায় কৃষকদের মাঝে বিতরণের চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে চাহিদা ও সরবরাহের তফাত এবং নির্দিষ্ট সময়ে অতিরিক্ত সারের চাহিদার কারণে কিছু স্থানে সাময়িক সংকট দেখা দিতে পারে।

আমন ধান কৃষকের শুধু একটি ফসল নয়- অনেক পরিবারের সারা বছরের খাদ্য ও আয়ের অন্যতম অবলম্বন। তাই সময়মতো সার না পাওয়া মানে শুধু উৎপাদন ব্যাহত হওয়া নয়; এর প্রভাব পড়ে কৃষক পরিবারের খাবার, শিক্ষা, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন জীবনেও।

কৃষকদের দাবি, বরাদ্দ ও বাস্তব চাহিদার মধ্যে সমন্বয় করে পর্যাপ্ত সার সরবরাহ, স্বচ্ছ তালিকা প্রণয়ন, সুষ্ঠু বিতরণ এবং নিয়মিত মাঠপর্যায়ে তদারকি নিশ্চিত করা হোক।

কৃষকের ভাষ্যমতে, আমরা চাই না দয়া- আমরা চাই আমাদের ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় সারটুকু সময়মতো পাওয়ার নিশ্চয়তা।

উখিয়ার কৃষকের এই আকুতি এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আসে কি না, সেটিই দেখার বিষয়।


google-news-feed আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
সম্পর্কিত খবর
উখিয়া বন বিভাগের ঘুম ভাঙবে কবে

উখিয়া বন বিভাগের ঘুম ভাঙবে কবে

২৪ ঘন্টার মধ্যে স্থাপনা সরাতে জেলা প্রশাসনের নির্দেশ

২৪ ঘন্টার মধ্যে স্থাপনা সরাতে জেলা প্রশাসনের নির্দেশ

কক্সবাজার পৌরসভার ৫ নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর সাহাব উদ্দিন সিকদার আর নেই

কক্সবাজার পৌরসভার ৫ নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর সাহাব উদ্দিন সিকদার আর নেই

বাস টার্মিনাল এলাকার আবাসিক হোটেলে নারীকে জবাই করে হত্যা, পুরুষ সঙ্গী পলাতক

বাস টার্মিনাল এলাকার আবাসিক হোটেলে নারীকে জবাই করে হত্যা, পুরুষ সঙ্গী পলাতক

উখিয়ায় পর্যাপ্ত সারের দাবিতে ক্ষুব্ধ আমন চাষিরা

উখিয়ায় পর্যাপ্ত সারের দাবিতে ক্ষুব্ধ আমন চাষিরা

কক্সবাজার জেলায় ১৮০টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের ১৫৫ টি চলছে নবায়ন ছাড়াই

কক্সবাজার জেলায় ১৮০টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের ১৫৫ টি চলছে নবায়ন ছাড়াই

সর্বশেষ সংবাদ