
পর্যটন নগরীতে অপরাধের বিস্তার....
রেনেসাঁ মদের বারে জোড়া খুন ও রাখাইন পল্লীতে মাদকের হাটে জনমনে আতঙ্ক,প্রশাসনের ‘নীরবতা

বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের শহর কক্সবাজারে অপরাধ চক্রের তৎপরতা ও মাদক ব্যবসার অবাধ বিস্তারে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে শহরের কেন্দ্রস্থলে বারের নিয়ম লঙ্ঘন করে অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছে মদ বিক্রি ও সন্ত্রাসী হামলায় জোড়া খুনের ঘটনা, অন্যদিকে জনবহুল সালাম মার্কেট ও রাখাইন পল্লীতে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা প্রকাশ্যে মাদকের বিকিকিনি—সব মিলিয়ে পর্যটন নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।

গত ২৮ আগস্ট (বৃহস্পতিবার) রাত সাড়ে ১১টার দিকে কক্সবাজার শহরের ঝাউতলায় অবস্থিত 'রেনেসাঁ হোটেল'-এর বারে কথা কাটাকাটির জেরে হামলা ও পাল্টা হামলায় দুই যুবক নিহত হন। নিহতরা হলেন শহরের নুনিয়ারছড়ার নাজিবুল হক রাশেদ (২৭) এবং বিডিআর ক্যাম্প এলাকার সোলাইমান ওরফে সালমান (২৯)।
সিসিটিভি ফুটেজ ও স্থানীয় সূত্রের তথ্যমতে, বারে প্রবেশ করে তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী তাজুয়ার হক রাধি ও তার সঙ্গী সালমান এলোপাতাড়ি কাঁচের বোতল ও ছুরি দিয়ে রাশেদকে আঘাত করে। রাশেদ নিচে নেমে লুটিয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। এদিকে পালিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয় জনতা সালমানকে ধরে গণপিটুনি দিয়ে মুমূর্ষু অবস্থায় পুলিশের হাতে সোপর্দ করে। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তারও মৃত্যু হয়।
'অ্যালকোহল নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা ২০২২' অনুযায়ী, ২১ বছরের কম বয়সী কারও কাছে মদ বিক্রি বা পারমিট দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। একই সঙ্গে বারে প্রবেশের আগে তল্লাশি এবং পারমিটধারীকে নির্দিষ্ট সীমার (সর্বোচ্চ ৩ ইউনিট) মধ্যে মদ সরবরাহের বিধান রয়েছে।
তবে ঘটনার পর কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অভিযান ও অপরাধ) ওয়াহিদুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত প্রাথমিক তদন্তে উঠে আসে চমকপ্রদ তথ্য। তিনি জানান, ঘটনার সময় বারে অবস্থানরত প্রায় কারও কাছেই মদ পানের বৈধ পারমিট ছিল না। এমনকি সেখানে অনেক অপ্রাপ্তবয়স্ককেও বসে মদ পান করতে দেখা গেছে। প্রবেশপথে কোনো ধরনের তল্লাশি ছাড়াই অস্ত্রসহ প্রবেশের বিষয়টি বারের চরম নিরাপত্তা ঘাটতিকে চিহ্নিত করে।
উল্লেখ্য, কক্সবাজারের অনুমোদিত ১০টি বারের (রেনেসাঁ, কয়লা, সী-গাল, সী প্যালেস, সী ক্রাউন, নিসংর্গ, কক্স-টু-ডে, সায়মান, ওশান প্যারাডাইস ও রয়েল টিউলিপ) অধিকাংশতেই বয়স ও পারমিট যাচাই না করেই মদ বিক্রির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের উপ-পরিচালক সোমেন মন্ডল জানান, জেলায় মাত্র সাড়ে ৫ শতাধিক ব্যক্তির বৈধ পারমিট রয়েছে। বারের নিয়ম লঙ্ঘনের এই বিষয়টি তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
একদিকে বারের অনিয়ম, অন্যদিকে শহরের অন্যতম ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকা বাজারঘাটার 'সালাম মার্কেট' সংলগ্ন রাখাইন পল্লী এখন অপরাধীদের নিরাপদ অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তালিকাভুক্ত শহরের ১৭টি প্রধান মাদক স্পটের মধ্যে এটি অন্যতম।
মিয়ানমার থেকে সীমান্ত পেরিয়ে আসা ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ (আইস), গাঁজা এবং স্থানীয় চোলাই মদের প্রধান ট্রানজিট পয়েন্ট হয়ে উঠেছে এই এলাকাটি। ভাসমান মাদক কারবারিদের পাশাপাশি ঘর ভাড়া নিয়ে চলছে অনৈতিক কর্মকাণ্ড (পতিতাবৃত্তি)। এতে পথচারী, সাধারণ ক্রেতা ও স্থানীয় অধিবাসীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অনৈতিক কাজ বন্ধে বারবার প্রশাসনকে জানিয়েও লাভ হয়নি। সম্প্রতি এক ভুক্তভোগী জাতীয় জরুরি সেবা '৯৯৯'-এ কল দিলে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে, তবে কোনো অপরাধীকে আটক বা কার্যকরী পদক্ষেপ না নিয়ে রহস্যজনকভাবে ফিরে যায়। ভুক্তভোগীদের দাবি, অসাধু কিছু সদস্য ও প্রভাবশালী মহলের মাসোহারা বা বাৎসরিক লেনদেনের কারণেই এই প্রকাশ্যে অপরাধযজ্ঞ বহাল তবিয়তে চলছে।
কক্সবাজারের সচেতন মহলের মতে, সরকারের কোটি কোটি টাকার জব্ধকৃত মাদক ধ্বংস করার প্রচারণা চললেও মূল স্পটগুলোতে নজরদারির অভাব রয়েছে। শহরের প্রাণকেন্দ্রে বারের অনিয়ম ও খোলা বাজারে মাদক বিকিকিনি বন্ধ করা না গেলে উঠতি বয়সের তরুণ সমাজ ধংসের মুখে পড়বে এবং পর্যটন শিল্প মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।
এ বিষয়ে জেলা পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে দ্রুত নিরপেক্ষ, কঠোর ও সাঁড়াশি অভিযান চালানোর জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ কক্সবাজারবাসী।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
