advertisement
advertisement

রোহিঙ্গা ত্রাণ তহবিলে জাতিসংঘের হরিলুট

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক

জুন ২৮, ২০২৬, ০৮:৫২

রোহিঙ্গা ত্রাণ তহবিলে জাতিসংঘের হরিলুট

ডাঃ কবীর উদ্দিন আহমদ:


বাংলাদেশ বর্তমানে ১৩ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিচ্ছে, যাদের মধ্যে প্রায় সাড়ে সাত লাখ ২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর দমন-পীড়ন থেকে বাঁচতে পালিয়ে এসেছিল। এই বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের জন্য জাতিসংঘ সারা বছর ধরে বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার অনুদান পেয়ে আসছে। এসব অনুদানের ব্যয় নিয়ে স্থানীয় জনগণসহ সুবিধাভোগীদের মাঝেও অনেক দিন থেকে নানা গুঞ্জন ছিল। 


সম্প্রতি জাতিসংঘের একটি অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় বাংলাদেশে জাতিসংঘ শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার (UNHCR) পরিচালিত রোহিঙ্গা ত্রাণ প্রকল্পে অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম এবং হরিলুটের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত এই নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, তারা একই ধরনের প্রকল্পে বাজেট বরাদ্দ করেছে; ফলে অপচয়, কাজের পুনরাবৃত্তি এবং সম্পদের অপব্যবহার হয়েছে। 


তাদের ব্যর্থতার কারণে শরণার্থীদের জন্য তৈরি স্বাস্থ্য অবকাঠামো এবং চিকিৎসা-সরঞ্জাম অব্যবহৃত রয়ে গেছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, উখিয়ায় নির্মিত ১৮ কোটি টাকার একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল এবং ভাসান চরে ২০ শয্যার একটি ইন-পেশেন্ট সুবিধা—যেটিতে ১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা মূল্যের সৌর সরঞ্জাম এবং ৮৯ লাখ টাকা মূল্যের একটি এক্স-রে মেশিন স্থাপন করা হয়েছিল—কোনো কাজেই আসেনি। এই নিরীক্ষায় ৪৩ কোটি ২০ লাখ টাকার পুষ্টি কর্মসূচিতেও অকার্যকারিতা লক্ষ্য করা গেছে। এমনকি তারা হাতি সুরক্ষার নামে ৯৯টি হাতি দেখার টাওয়ারে ২৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিল, যা পরবর্তীতে অকার্যকর বলে গণ্য হয়।


প্রতিবেদনে বলা হয়, ১০ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে ১২৩ জন অংশীদার কর্মী নিয়োগ করা সত্ত্বেও, ২১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা রেফারেল কর্মসূচিতে সঠিক উপকারভোগী নির্বাচনের মানদণ্ড ছিল না, নির্দেশিকাগুলো ছিল পুরোনো এবং হাসপাতালের চুক্তিগুলোর মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল। এমনকি অতীতে কালো তালিকাভুক্ত এক ভেন্ডরকে ২১ কোটি ৮৪ লাখ টাকার চুক্তি দিয়েছিল, যে মেডিকেল সুঁইয়ের মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ পরিবর্তন করেছিল। এছাড়া উচ্চ মূল্যের এক ভেন্ডরকে নির্বাচন করায় আরও ১ কোটি ১৭ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে। পাশাপাশি একটি হেলথ ইনফরমেশন সিস্টেমে ১ কোটি ৯৯ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছিল, যা ২০১৮ সাল থেকে অকার্যকর অবস্থায় পড়ে রয়েছে।


ইউএনএইচসিআরের ৪০০ জনেরও বেশি দেশি-বিদেশি নিজস্ব কর্মী (স্টাফ মেম্বার) থাকা সত্ত্বেও সংস্থাটি তুলনামূলক যোগ্যতা মূল্যায়ন ছাড়াই কর্মসূচির ৬২ শতাংশ বাস্তবায়নের দায়িত্ব অংশীদারদের ওপর ছেড়ে দিয়েছিল। বেশিরভাগ স্থানীয় অংশীদার তাদের অর্থায়নের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল, যা খরচ ভাগাভাগির (কস্ট-শেয়ারিং) ধারণাকে ক্ষুণ্ন করেছে এবং এর ফলে প্রকল্প-সহায়তা খরচ বাবদ মোট ৭৩ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। অন্যদিকে, অংশীদাররা এমনসব সামগ্রী কিনেছে, যা ইউএনএইচসিআর ইতোমধ্যে কিনেছিল। এর মধ্যে রয়েছে ৫০ কোটি ৪০ লাখ টাকা মূল্যের আশ্রয়-সামগ্রী, মোট ২ কোটি ৩৩ লাখ টাকার সোলার ও এনার্জি প্রকল্প এবং ৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা মূল্যের ওষুধ ও চিকিৎসা-সরঞ্জাম। 


সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং বাস্তবায়নকারী অংশীদারদের মধ্যে দুর্বল সমন্বয়ের কারণে একই এলাকায় ১২৮টি পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ নেটওয়ার্ক, ৫২টি পাম্পিং স্টেশন এবং ২০,০০০-এরও বেশি নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে, যা কাজের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছে। পানি সরবরাহের পরিমাণেও অসঙ্গতি দেখা গেছে, যেখানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (Sphere Standards) অনুযায়ী প্রতিজনের জন্য দৈনিক ২০ লিটার পানি নিশ্চিত করার কথা, সেখানে উখিয়ায় দেওয়া হচ্ছে প্রতিজনে দৈনিক ৩০ লিটার।


যথাযথ নির্দেশিকা ছাড়াই বছরের শেষে অতিরিক্ত তহবিল বরাদ্দের ফলেও অদক্ষতা ও অপচয় হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, একটি সরকারি অংশীদার ২০২৩ সালের নভেম্বরে ৫ কোটি ১৬ লাখ টাকা পেয়েছিল এবং বছরের শেষের সময়সীমা ধরার তাড়াহুড়োয় ক্রয়ের নিয়মকানুন উপেক্ষা করায় নির্মাণকাজে গুণগত মানের সমস্যা দেখা দিয়েছিল। অন্যান্য প্রশ্নবিদ্ধ খরচের মধ্যে রয়েছে অনার বোর্ডের জন্য ২২ লাখ টাকা, কর্মীদের ইউনিফর্মের জন্য ২৮ লাখ টাকা এবং একটি ডকুমেন্টারির জন্য ৩৩ লাখ টাকা ব্যয়। 


সরকারের সঙ্গে অবকাঠামো উন্নয়নের সমঝোতা স্মারক থাকা সত্ত্বেও তারা ভাসান চরে ৬ কোটি ৩৪ লাখ টাকা মূল্যের জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এর ফলে সরকারের ইতোমধ্যে ৯৬ লাখ টাকা ব্যয়ে সম্পন্ন করা তিনটি সুবিধার সোলারাইজেশনের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে এবং ৩০ লাখ টাকা মূল্যের অপ্রয়োজনীয় ভোল্টেজ রেগুলেটর স্থাপন করা হয়েছে। প্রায় ৩০০ কোটি টাকার নির্মাণকাজের জন্য একক একজন ঠিকাদারের ওপর নির্ভর করেছিল, যার দর ছিল বাজারমূল্যের চেয়ে ২৬ শতাংশ বেশি। এর ফলে সম্ভাব্য ৭৮ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে, যেখানে কম দামের ভেন্ডরদের ব্যবহার করা হয়নি।


অডিটে জ্বালানি কর্মসূচির খরচও বাড়িয়ে দেখানোর তথ্য পাওয়া গেছে, যা বাজারদরের চেয়ে ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত বেশি ছিল এবং ক্ষতির মধ্যে রয়েছে সোলার প্রকল্পে ৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা এবং বৈদ্যুতিক কাজে ১৮ কোটি টাকা। মোট ২৯০ কোটি ৪০ লাখ টাকার এলপিজি সিলিন্ডার রিফিল ক্রয় করা হয়েছিল, যা প্রয়োজনের চেয়ে ৬৬ কোটি টাকা বেশি ছিল। অন্যদিকে, প্রেসার কুকার ব্যবহারের ওপর পরিচালিত একাধিক পাইলট স্টাডির সুপারিশ বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণে আনুমানিক ২৪ কোটি টাকা সম্ভাব্য সাশ্রয় হাতছাড়া হয়েছে।


ইউএনএইচসিআর তাদের পরিবহন বহরকে সাশ্রয়ী ও সুবিন্যস্ত করতে প্রয়োজনীয়তা মূল্যায়ন করতেও ব্যর্থ হয়েছে। ফলে সংস্থাটি ১৬টি ক্যাম্পজুড়ে ৫২টি প্রোগ্রাম যানবাহন চালানোর কোনো যৌক্তিকতা দেখাতে পারেনি, বা মাত্র ২৯ জন চালক দ্বারা পরিচালিত ৪৮টি প্রশাসনিক যানবাহনের পুলের বিষয়েও কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। অডিটের সময় ১০৪টি যানবাহনের মধ্যে ১০টি দীর্ঘ সময় ধরে অচল থাকলেও ভাড়া বাবদ ৯৬ লাখ টাকার বেশি পরিশোধ করা হয়েছিল। এমনকি সংস্থাটি একটি অব্যবহৃত মোটেলের জন্য আট বছর ধরে বার্ষিক ১ কোটি ৫১ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে, যেখানে বছরে ৪৩ লাখ টাকা মূল্যে একটি বিকল্প জায়গা পাওয়া যেত। ১২ কোটি টাকার বেশি পরিহারযোগ্য অপচয় হয়েছে।


অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায়ই যদি এই অবস্থা হয়, বহিরাগত নিরীক্ষায় কী অবস্থা হতে পারে, একবার চিন্তা করুন! সম্প্রতি এই নিয়ে সুলেমান সালমান 'নিউ এজ' পত্রিকায় ইংরেজিতে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন। এই প্রতিবেদনের সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, ইউএনএইচসিআর-এর একজন কর্মকর্তা শারি নিজম্যান উক্ত প্রতিবেদককে বলেন, "সর্বোচ্চ মান এবং দক্ষতা বজায় রেখে বাংলাদেশের রোহিঙ্গাদের কাছে যেন সবচেয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।" জাতিসংঘের এইসব কর্তাব্যক্তিরা সবসময় শুধু প্রতিশ্রুতিবদ্ধই থাকেন।


লেখক: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

google-news-feed
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে হাতির ডেরা এলাকায় অজ্ঞাত ব্যক্তির কঙ্কাল উদ্ধার!

বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে হাতির ডেরা এলাকায় অজ্ঞাত ব্যক্তির কঙ্কাল উদ্ধার!

শহরে ইয়াবাসহ দম্পতি আটক,নেতৃত্বে কক্সবাজার সদর ওসি শেথ মোহাম্মদ আলী

শহরে ইয়াবাসহ দম্পতি আটক,নেতৃত্বে কক্সবাজার সদর ওসি শেথ মোহাম্মদ আলী

ঝিনাইদহে ভ্যানের ধাক্কায় পথচারী নিহত

ঝিনাইদহে ভ্যানের ধাক্কায় পথচারী নিহত

সিলেটে তেলবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত, রেল যোগাযোগ বন্ধ

সিলেটে তেলবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত, রেল যোগাযোগ বন্ধ

মৌলভীবাজারে পানিতে ডুবে ৩ শিশুর মৃত্যু

মৌলভীবাজারে পানিতে ডুবে ৩ শিশুর মৃত্যু

ঝালকাঠিতে ৪২ মণ জাটকা জব্দ

ঝালকাঠিতে ৪২ মণ জাটকা জব্দ

সর্বশেষ সংবাদ