
জালিমের প্রাসাদ যত উঁচুই হোক, ন্যায়বিচারের আকাশ তারও ঊর্ধ্বে।

পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক সম্রাট ভেবেছিলেন তাঁদের ক্ষমতার সূর্য আর কখনো অস্ত যাবে না। অনেক শাসক ধারণা করেছিলেন, রাষ্ট্রযন্ত্র, সেনাবাহিনী , আদালত, আইন, প্রচারমাধ্যম - সবকিছু নিজেদের ইচ্ছামতো পরিচালনা করতে পারলেই ইতিহাসকেও বন্দী করা যায়। কিন্তু ইতিহাসের এক অদ্ভুত স্বভাব আছে; সে কখনো ক্ষমতার ভাষায় কথা বলে না, সে কথা বলে সত্যের ভাষায়। আর সত্যের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সাক্ষী হলো সময়।
জুলুমের পায়ের শব্দ প্রথমে খুব প্রবল শোনায়। তার মিছিল দীর্ঘ হয়, পতাকা উঁচু হয়, স্লোগান আকাশ কাঁপায়। কিন্তু তার ভেতরে জন্ম নিতে থাকে নীরব পতনের বীজ। কারণ জুলুম কখনো কেবল নির্যাতিতের চোখে অশ্রু ঝরায় না; তা জালিমের ভবিষ্যৎও ধ্বংস করে।

পৃথিবীর বহু রাষ্ট্র নিজেদের গণতান্ত্রিক, সাংবিধানিক ও বহুত্ববাদী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচয় দেয়। তাদের সংবিধানে নাগরিকের সমতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং আইনের শাসনের নিশ্চয়তা থাকে। স্বাধীনতার ইতিহাসেও বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা ও সম্প্রদায়ের মানুষের রক্ত ও আত্মত্যাগ মিশে থাকে। তাই কোনো জনগোষ্ঠীর অবদানকে অস্বীকার করা কিংবা তার নাগরিক অধিকারকে সংকুচিত করা শুধু সেই জনগোষ্ঠীর প্রতি অন্যায় নয়; তা ইতিহাস ও রাষ্ট্রের নিজস্ব সাংবিধানিক অঙ্গীকারের প্রতিও অবিচার।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বৈষম্য, ঘৃণামূলক বক্তব্য, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগের কথা শোনা যাচ্ছে। কোথাও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে মানুষ হয়রানি বা সহিংসতার শিকার হচ্ছে, কোথাও উপাসনালয় নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হচ্ছে, কোথাও আবার আইন প্রয়োগের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এসব অভিযোগের প্রতিটি ঘটনার সত্যতা অবশ্যই নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনসম্মত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়া উচিত। কিন্তু একটি বিষয় অনস্বীকার্য - একটি গণতন্ত্রের শক্তি অভিযোগ অস্বীকারে নয়, বরং ন্যায়সঙ্গত জবাবদিহিতে।
যখন কোনো মানুষের ঘর ভেঙে দেওয়া হয়, তখন শুধু একটি পরিবার আশ্রয় হারায়। কিন্তু যখন একটি উপাসনালয় ভেঙে দেওয়া হয়, তখন আঘাত লাগে মানুষের আত্মপরিচয়, বিশ্বাস ও সম্মিলিত স্মৃতিতে। একটি মসজিদ, একটি মন্দির, একটি গির্জা কিংবা একটি গুরুদ্বারা - এসব কেবল স্থাপনা নয়; এগুলো মানুষের আত্মার ঠিকানা। যে রাষ্ট্র মানুষের সেই ঠিকানাকে অনিরাপদ করে তোলে, সে রাষ্ট্র নিজের নৈতিক ভিত্তিকেই দুর্বল করে।
আজ যদি কোথাও আযান দিতে বাধা দেওয়া হয়, কাল হয়তো অন্য কোথাও ঘণ্টাধ্বনি থামিয়ে দেওয়া হবে। আজ যদি একটি ধর্মের উপাসনালয় নিরাপদ না থাকে, কাল অন্য ধর্মের উপাসনালয়ও নিরাপদ থাকবে - এ নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না। কারণ সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের আগুন কখনো একটি বাড়িতে সীমাবদ্ধ থাকে না; বাতাস পেলে তা পুরো জনপদকে গ্রাস করে।
পবিত্র কুরআন জুলুম সম্পর্কে এমন এক চিরন্তন সত্য ঘোষণা করেছে, যা শুধু কোনো একটি জাতির জন্য নয়, সব যুগের সব শাসকের জন্য সতর্কবার্তা—
"তুমি কখনো মনে করো না যে, আল্লাহ জালিমরা যা করে সে সম্পর্কে উদাসীন। তিনি তাদেরকে শুধু সেই দিন পর্যন্ত অবকাশ দেন, যেদিন তাদের দৃষ্টি স্থির হয়ে যাবে।" (কোরআন: ১৪:৪২)।
এ আয়াতের ভাষা বজ্রের মতো কঠোর, আবার ন্যায়ের মতো শান্ত। এখানে প্রতিশোধের উল্লাস নেই; আছে বিচারকের নিশ্চুপ ঘোষণা। আল্লাহ তাড়াহুড়ো করেন না, কিন্তু ভুলেও যান না। তিনি সময় দেন, যাতে জালিম ফিরে আসতে পারে। কিন্তু যখন সে সীমা অতিক্রম করে, তখন ইতিহাসের পাতায় তার পতনের অধ্যায় লেখা শুরু হয়।
কোরআনে আরও বলা হয়েছে -
"এবং জালিমরা অচিরেই জানতে পারবে, তারা কোন পরিণতির দিকে ফিরে যাচ্ছে।" (কোরআন: ২৬:২২৭)।
এই সতর্কবাণী কোনো একটি ধর্ম বা ভূখণ্ডের জন্য নয়। যে ব্যক্তি ক্ষমতার অপব্যবহার করে, যে প্রতিষ্ঠান দুর্বল মানুষের অধিকার কেড়ে নেয়, যে রাষ্ট্র অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়, যে সমাজ অন্যায় দেখেও নীরব থাকে - সবার জন্যই এ সতর্কতা সমানভাবে প্রযোজ্য।
আবার কোরআন ঘোষণা করছে—
"নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষদের প্রতি বিন্দুমাত্র জুলুম করেন না; বরং মানুষ নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম করে।" (কোরআন: ১০:৪৪)
কী গভীর এই শিক্ষা! অন্যকে পদদলিত করতে গিয়ে মানুষ শেষ পর্যন্ত নিজের বিবেক, নিজের সমাজ এবং নিজের ভবিষ্যৎকেই ধ্বংস করে। জুলুমের সবচেয়ে বড় পরাজিত কখনো কখনো জালিম নিজেই।
তবে কোরআনের ন্যায়বিচার একমুখী নয়। এটি মজলুমের পক্ষে দাঁড়ায়, আবার ন্যায়ের মানদণ্ডও নির্ধারণ করে দেয় -
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায়বিচারের উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো। কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে ন্যায়বিচার বর্জন করতে উদ্বুদ্ধ না করে। ন্যায়বিচার কর; এটাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।"
(কোরআন: ৫:৮)।
এই আয়াত আমাদের শেখায়, ন্যায়বিচার মানে প্রতিপক্ষের জন্যও ন্যায়বিচার। যে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিজেই অন্যায় করে, সে কোরআনের শিক্ষা থেকে বিচ্যুত হয়। তাই আমাদের অবস্থান হওয়া উচিত - যেখানেই জুলুম, যার বিরুদ্ধেই জুলুম, আমরা তার বিরোধিতা করব। মুসলমানের ওপর জুলুম যেমন অন্যায়, তেমনি হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, শিখ বা অন্য যে কোনো মানুষের ওপর জুলুমও সমান অন্যায়।
সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় তার অট্টালিকার উচ্চতায় নয়; তার পরিচয় নির্ধারিত হয় সংখ্যালঘু নাগরিক কতটা নিরাপদ, ভিন্নমতাবলম্বী কতটা স্বাধীন এবং দুর্বল মানুষ কতটা ন্যায়বিচার পায় - তার ওপর। সংখ্যাগরিষ্ঠের শক্তি নয়, দুর্বলতম নাগরিকের নিরাপত্তাই গণতন্ত্রের প্রকৃত পরীক্ষা।
ক্ষমতার ইতিহাস ক্ষণস্থায়ী; ন্যায়বিচারের ইতিহাস চিরস্থায়ী। রাজদণ্ড একদিন হাতবদল হয়, পতাকা বদলে যায়, সিংহাসনের মালিক বদলে যায়; কিন্তু মানুষের দীর্ঘশ্বাস কখনো হারিয়ে যায় না। নির্যাতিত মানুষের চোখের জল ইতিহাসের পাতায় কালি হয়ে থাকে, আর আল্লাহর আদালতে সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।
আজ যারা মনে করছেন ক্ষমতাই শেষ সত্য, তাদের মনে রাখা উচিত - ক্ষমতারও একটি সন্ধ্যা আছে। সূর্য যতই প্রখর হোক, অস্ত যেতে তাকে হয়ই। কিন্তু ন্যায়বিচারের সূর্য কখনো অস্ত যায় না।
অতএব, পৃথিবীর যে প্রান্তেই হোক, রাষ্ট্র, শাসক, প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তি - যে-ই মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করবে, ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবে, উপাসনালয় ধ্বংস করবে অথবা বৈষম্যকে রাষ্ট্রনীতি কিংবা সামাজিক আচরণে পরিণত করবে, সে আল্লাহর বিচারের বাইরে নয়। আল্লাহ অবকাশ দেন, কিন্তু ছেড়ে দেন না। ইতিহাসও সেই সাক্ষ্য বহন করে।
জুলুমের প্রাসাদ যত উঁচুই হোক, ন্যায়বিচারের আকাশ তারও ঊর্ধ্বে। আর সেই আকাশের মালিক একমাত্র আল্লাহ। তাঁর আদালতে কোনো ক্ষমতা, কোনো প্রচার, কোনো বাহিনী, কোনো সংখ্যাগরিষ্ঠতা - কোনোটিই ন্যায়বিচারের বিকল্প হতে পারে না।
শেষ পর্যন্ত বিজয় সত্যেরই হয়, পরাজয় জুলুমেরই। কারণ ক্ষমতা মানুষের হাতে সাময়িকভাবে থাকতে পারে, কিন্তু ন্যায়বিচারের চূড়ান্ত মালিকানা কোনো মানুষের নয় - তা মহান আল্লাহর।
লেখক:
সাবেক অধ্যক্ষ, কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ ও সাবেক বিভাগীয় প্রধান, শিশু স্বাস্থ্য বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিকেল কলেজ।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
