
পলাতক থেকে রোহিঙ্গাকে দিয়ে কলাতলীতে পাহাড় কাটছেন চিহ্নিত ভূমিদস্যু নুরুল আলম

কক্সবাজার পর্যটন শহরের কলাতলীতে সরকারি ও খাস জমি দখল করে ১০ একরের বিশাল পাহাড় কেটে অবৈধভাবে প্লট তৈরির অভিযোগে চিহ্নিত ভূমিদস্যু নুরুল আলমের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা হলেও থামেনি পাহাড় নিধন। আদালত ও পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্দেশে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করার পর অভিযুক্ত নুরুল আলম আত্মগোপনে থাকলেও থেমে নেই পাহাড় কাটার মহোৎসব। স্থানীয়দের অভিযোগ, পলাতক থেকে রশিদ আলম মাঝি নামক এক রোহিঙ্গা নাগরিক ও টার্মিনালের দেলোয়ারকে দিয়ে দিন-রাত পাহাড় কেটে সরকারি কোটি টাকার জমি দখল ও মাটি পাচারের প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছেন তিনি।
সরেজমিনে দেখা যায়, কলাতলী প্রধান সড়কের পাশে বিকাশ বিল্ডিংয়ের পেছনে ঝিলংজা মৌজার ১৭০৫০ দাগভুক্ত প্রায় ১০ একর আয়তনের সরকারি ও খাস পাহাড় গত ছয় মাস ধরে দেদারসে কাটা হচ্ছে। উঁচু পাহাড়ের একাধিক স্থান কেটে ইতোমধ্যে ১৫ থেকে ২০টি প্লট তৈরি করা হয়েছে। এসব পাহাড় কাটার মাটি রাতের আঁধারে ডাম্পারযোগে অন্যত্র পাচার করা হচ্ছে।

পলাতক নুরুল আলমের নির্দেশে মাঠে থেকে কাজ তদারকি করছেন রোহিঙ্গা রশিদ আলম মাঝি ও টার্মিনালের দেলোয়ার। পাহাড় কাটার কাজে নিয়োজিত এক শ্রমিক নিজেকে মিয়ানমারের নাগরিক পরিচয় দিয়ে জানান, তিনি পাহাড়ের কেয়ারটেকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং দৈনিক মজুরিতে শ্রমিক এনে পাহাড় কেটে প্লটের আকৃতি দেওয়া হচ্ছে।
কলাতলীতে ১০ একরের এই পাহাড়ে দেদারসে ধ্বংসযজ্ঞ চলা সত্ত্বেও কার্যকর আইনগত পদক্ষেপ না নেওয়া নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে তা পরিবেশ আদালতের নজরে আসে।
গত ৩০ জুলাই কক্সবাজার পরিবেশ আদালতের স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট ও ১ নম্বর আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এস.এম গিয়াস উদ্দিন জনস্বার্থে ও পরিবেশ সুরক্ষার উদ্দেশ্যে স্বপ্রণোদিত হয়ে মিস মামলা (নং-০৩/২০২৬) দায়ের করেন। পরিবেশ আদালতের নির্দেশে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালককে সরেজমিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে স্থিরচিত্রসহ বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়। এর আগে আদালতের আদেশে ও পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষে কক্সবাজার সদর মডেল থানা পুলিশ বাদী হয়ে ‘ইমারত নির্মাণ আইন’ ও পরিবেশ আইনে পৃথক ৩টি মামলা দায়ের করেছিল।
অনুসন্ধানে ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঈদগাঁও উপজেলার মৃত নুরুল কবিরের ছেলে নুরুল আলমের নেতৃত্বে ২০-৩০ জনের একটি অপরাধী চক্র এই বিশাল পাহাড় সাবাড় করার কাজে জড়িত।বসবাসকারীদের তথ্যমতে জানা গেছে, এই বিশাল পাহাড় কর্তনে জড়িত (পাহাড় শ্রেণীর) জমির মালিক ও পাহাড় দখলদার, ঈদগাঁও উপজেলার মৃত নুরুল কবিরের পুত্র নুরুল আলম, (পাহাড় শ্রেণী খতিয়ান ৮৩২৪ এর মালিক) পৌরসভা ১২নং ওয়ার্ড লাইটহাউস এলাকার হামিদ হোসেনের পুত্র মুনিব খাঁন, (পাহাড় শ্রেণীভূক্ত) ৮১২৪ খতিয়ানের মালিক, চট্টগ্রাম নাসিরাবাদ, জাকির হোসেন রোডের মৃত ইয়াকুব আলী ভূইয়ার পুত্র মোহাম্মদ ইরফান আলী ভূইয়া, (পাহাড় শ্রেণীর) প্লট মালিক চৌফলদন্ডীর সদর এলাকার মোঃ সাজ্জাদ (পাহাড় শ্রেণীর) প্লট মালিক, চট্টগ্রামের আতিকুল ইসলাম শিবলী, মহেশখালী থানা এলাকার বাসিন্দা সদর হাসপাতালের ডা. সাইফুল ইসলাম, কলাতলী চৌদ্দগ্রাম এলাকার মুস্তাফিজুর রহমানের পুত্র মহিউদ্দিন টিটু, পৌরসভা ১২ নং ওয়ার্ড মধ্যম কলাতলী এলাকার মৃত মীর কাসেম এর পুত্র ডাম্পার মালিক খালেক, (পাহাড় শ্রেণীর) প্লট মালিক, উখিয়া থানার রাজাপালং খয়রাতি পাড়ার ছিদ্দিক আহম্মদ পুত্র মোঃ ইলিয়াছ সহ ১৫/২০ জনের একটি পাহাড়খেকো সিন্ডিকেট অপ্রতিরুদ্ধ ভাবে পাহাড় কেটে সাবাড় করছে বলে তথ্যসূত্রে উঠে এসেছে।
এর আগে সদর সহকারী কমিশনার (ভূমি) শারমিন সুলতানা ও মসিউর রহমান এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা একাধিকবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তবে প্রশাসনিক অভিযানের পরও দৃশ্যমান কঠোর ব্যবস্থা না থাকায় অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে একই এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি এস্কেভেটর জব্দ করে তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) আরিফ উল্লাহ নিজামী স্থানীয় ইউনুছ মেম্বারের জিম্মায় দিয়েছিলেন। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, ওই রাতেই একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে জিম্মাদারকে মারধর ও অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে জব্দকৃত এস্কেভেটরটি ছিনিয়ে নিয়ে যায়।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ কলিম বলেন,মহাসড়কের পাশে ১০ একরের বিশাল পাহাড়টি কেটে ডাম্পারে মাটি সরিয়ে নেওয়ায় পরিবেশের প্রাকৃতিক গঠন ধ্বংস হচ্ছে। বর্ষায় এখানে ভয়াবহ ভূমিধসের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। অবিলম্বে এই সিন্ডিকেটের সদস্যদের গ্রেফতার ও পাহাড়টি উদ্ধার করে সংরক্ষণ করা না হলে পর্যটন শহরের পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।
অভিযোগের বিষয়ে আত্মগোপনে থাকা নুরুল আলম মুঠোফোনে জানান, আমি প্রায় এক বছর আগে পাহাড়ে কাজ করেছিলাম। বর্তমানে পাহাড় কাটার সাথে আমি জড়িত নই। শত্রুতামূলকভাবে আমার বিরুদ্ধে এসব মিথ্যা অভিযোগ তোলা হচ্ছে।
কক্সবাজার সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মসিউর রহমান জানান,আদালতের আদেশে মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার পরও যদি কেউ অবৈধভাবে পাহাড় কাটা বা দখল কার্যক্রম অব্যাহত রাখে, তবে সরেজমিন পরিদর্শন করে জড়িত সকলের বিরুদ্ধে নতুন করে কঠোর আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
